ইউরোপের বিস্তৃত এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে দাবানল
ফ্রান্সে প্রেসিডেন্টের জরুরি বৈঠক
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিত: ০১:১৫, ২৮ জুলাই ২০২৬; আপডেট: ০২:৫৪, ২৮ জুলাই ২০২৬
পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম না থাকায় দমকল কর্মীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইউরোপের দক্ষিণপশ্চিমাংশের বিস্তৃত এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে ভয়াবহ দাবানল। এ অবস্থায় এরইমধ্যে ৩ লাখ ২৫ হাজারেরও বেশি বাসিন্দাকে তাদের বাসভবন থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে ফ্রান্স ও স্পেন।
ইউরোপজুড়ে রেকর্ড সর্বোচ্চ তাপমাত্রার ঘটনার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরই ফ্রান্সে ভয়াবহ এ দাবানল ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটিই দেশটিতে সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলের ঘটনা। পরিস্থিতি সামাল দিতে এরইমধ্যে হাজার হাজার দমকল কর্মী নিয়োগ দিয়েছে ফ্রান্স।
এ অবস্থায় গতকাল সোমবার সকালে মন্ত্রীদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এম্যানুয়েল ম্যাক্রোন। দেশটির প্রেসিডেন্টের সরকারি কার্যালয় এলিসি প্রাসাদ থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এদিকে, ফ্রান্সের মতো স্পেনেও বিস্তৃত এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে দাবানল। এর প্রভাবে উভয় দেশেই শত শত ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হয়েছে লাখ লাখ মানুষকে। এদের অধিকাংশই এখন অবস্থান করছে ইনডোর স্টেডিয়াম বা কমিউনিটি সেন্টারে।
চরমাভাবাপন্ন আবহাওয়াই এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা।

ফ্রান্সের পরিস্থিতি :
চলমান এ দাবানলে এখনও পর্যন্ত দেশটির দক্ষিণপশ্চিমাংশের জিরোন্ডে নামের অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত বুধবার থেকে এ পর্যন্ত দাবানলে এ অঞ্চলের ২৪০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে শুধু লা পোর্জে পৌর এলাকারই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ১৭০টি বাড়ি। এ অঞ্চলের মেয়র জ্যঁ লাজেরোউইজ বার্তাসংস্থা এএফপিকে এসব তথ্য জানান।
দাবানল নিয়ন্ত্রণে এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৫০০ দমকল কর্মী, ১ হাজার ৫০০ সেনা সদস্য এবং ১ হাজার ২০০ পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে, দাবানল নিয়ন্ত্রণের কাজ করতে গিয়ে এর মধ্যে আহত হয়েছে ৮৪ জন দমকল কর্মী।
এদিকে, দমকল কর্মীদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়াই দাবানল থেকে সৃষ্ট প্রচণ্ড বিষাক্ত ধোঁয়া এবং বাতাসে থাকা ক্ষতিকর পদার্থের মধ্যে কাজে পাঠানো হচ্ছে বলে কর্মীদের ইউনিয়ন থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। এ অবস্থায় খুব দ্রুত তাদের জন্য আরও উন্নতমানের সুরক্ষা ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
একইসঙ্গে, কার্বণ মনোক্সাইডের সংস্পর্শে আসা কর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতে তাদের হাইপারবেরিক চেম্বারে রেখে সেবা দেওয়ারও প্রস্তাব করা হয়। হাইপারবেরিক চেম্বার এমন একটি মেডিকেল যন্ত্র যেখানে রোগিদের রোগ সরাতে ও চিকিৎসা দিতে স্বাভাবিক মাত্রার তুলনায় বেশি মাত্রায় শতভাগ অক্সিজেন প্রয়োগ করা হয়।
এদিকে, দাবানলের কারণে আগুনের লেলিহান শিখার উপরিভাগে একধরনের ঘন-লম্বা বজ্রঝড়ের মতো মেঘের সৃষ্টি হয়েছে যা থেকে আগুন আরও ছড়িয়ে পড়ছে। কারণ, এ মেঘের দলা নিজেই প্রচণ্ড ঝড়ো বাতাস, বজ্রপাত এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ঘূর্ণিঝড় তৈরি করতে সক্ষম।
আবহাওয়ার এ ধরনের অবস্থা আগে আর কখনো দেশটিতে দেখা যায় নি বলে জানিয়েছে ফ্রান্সের দমকল কর্মীদের জাতীয় ফেডারেশন।

এ অবস্থায় ফ্রান্সের দক্ষিণপশ্চিমাংশের বর্ডোক্সে এরইমধ্যে ছড়িয়ে পড়া দাবানলে নতুন করে বাতাস সঞ্চারিত হওয়ায় এ অঞ্চলের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে বলে গতকাল জানান দেশটির অর্থমন্ত্রী রোনাল্ড লেসকার।
স্পেনের বর্তমান পরিস্থিতি :
ফ্রান্সের পার্শ্ববর্তী দেশ স্পেনের দাবানল পরিস্থিতিও ভয়াবহ আকার নিয়েছে। একে ‘বিশাল এক দানব’ হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়ে জাতীয় জনপ্রতিরক্ষা প্রধান ভার্জিনিয়া বার্কোনেস গত রবিবার সরকারি গণমাধ্যম টিভিইকে বলেন, ‘আমাদের বর্তমানে প্রায় ৭৭ হাজার হেক্টর এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ২৮০ কিলোমিটারের বিশাল এক দৈত্যের সঙ্গে লড়তে হচ্ছে।’
এরইমধ্যে স্পেনের মাদ্রিদ এবং পূর্বাঞ্চলের ভেলেন্সিয়া অঞ্চল থেকে প্রায় ৭৫ হাজার বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এদিকে, বাতাসের কারণে মাদ্রিদের দক্ষিণে আগুন ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে, এ পথে থাকা গ্রামগুলো থেকে আরও বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। স্পেনের দাবানলে এখনও পর্যন্ত ভেলেন্সিয়ায় একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
এ অবস্থায় সামনের সপ্তাহগুলোতে ফ্রান্স ও স্পেনের দাবানল ছড়িয়ে পড়া এলাকাগুলোতে গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে আগুন আরও বিস্তৃত এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার ও আরও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মূলত, বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে জলবায়ুর উপর। ফলে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাবেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আবহাওয়ার অস্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে। এর ফলে গ্রীষ্মে প্রচণ্ড দাবদাহ, দাবানল, খরা, ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে।

শীতকালেও শীত প্রধান দেশগুলোতে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের অনেক নিচে নেমে যাওয়া, ভয়াবহ তুষার ঝড় সৃষ্টির মতো ঘটনা ঘটছে। অন্যদিকে, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলগুলোতে এমনকি শীতেও থাকছে অস্বাভাবিক উষ্ণ তাপমাত্রা।
আর, আবহাওয়ার অস্বাভাবিক এ আচরণের প্রভাব পড়ছে জনগণের জীবন-জীবিকা ও দেশগুলোর আর্থ-সামাাজিক অবস্থার উপর। একইসঙ্গে, ঘটে চলেছে অনাকাঙ্খিত ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা।
সূত্র : ডয়চে ভেলে, বিবিসি, সিএনএন।



