অন্যান্য

কলম্বিয়ায় শক্তিশালী ভ‍‍ূমিকম্প : তিন হাজারের বেশি নিখোঁজ

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশিত: ০২:৪৬, ১২ আগস্ট ২০২৬;  আপডেট: ০৩:০৩, ১২ আগস্ট ২০২৬

কলম্বিয়ায় শক্তিশালী ভ‍‍ূমিকম্প : তিন হাজারের বেশি নিখোঁজ

ভূমিকম্পের আঘাতে কলম্বিয়ার ক্যালি, পেরেইরা, ম্যানিজালেস, কুইম্বদো এবং বুইনাভেঞ্চুরা শহরগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ায় আঘাত হানা শক্তিশালী ভূমিকম্পে এ পর্যন্ত ২২৪ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। গত সোমবার আঘাত হানা ৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভয়াবহ এ ভূমিকম্পে আরও প্রায় ৬৬৮ জন আহত হয়েছে।

দেশটিতে চলতি দশকের সবচেয়ে শক্তিশালী এ ভূমিকম্পে বর্তমানে তিন হাজারেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছে। এ অবস্থায় গতকাল মঙ্গলবারও কলম্বিয়ার বিভিন্ন শহরে ব্যাপক উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত ছিলো।

কলম্বিয়ার পশ্চিমাংশের চোকো অঞ্চলের সান হোসে দেল পালমারে সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৩৪ মিনিটে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। অঞ্চলটি রাজধানী বোগোটা থেকে  ৪০০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। 

ভূমিকম্পের আঘাতে কলম্বিয়ার ক্যালি, পেরেইরা, ম্যানিজালেস, কুইম্বদো এবং বুইনাভেঞ্চুরা শহরগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এর মধ্যে ক্যালি ও পেরেইরা শহরে এ পর্যন্ত যথাক্রমে ৮৫ ও ৬৬ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।

এ অবস্থায় রাষ্ট্রীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন কলম্বিয়ার নবনিযুক্ত প্রেসিডেন্ট অ্যাবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েল্লা। মাত্র এক সপ্তাহ আগে অর্থাৎ গত ৬ আগস্ট ক্ষমতা গ্রহণ করা প্রেসিডেন্ট বর্তমানে উদ্ধার কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে সব ধরনের উদ্যোগ নিয়েছেন বলে সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়েছে।

একইসঙ্গে, ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আর্থিক সহায়তারও ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট এসপ্রিয়েল্লা। ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা রিসারালদা পরিদর্শনে গিয়ে গতকাল এ ঘোষণা দেন তিনি। 

 নিহতের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে এখনও নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।

এটি কলম্বিয়ার কফি অঞ্চল হিসেবে সুবিখ্যাত। রিসারালদার রাজধানী পেরেইরা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শহরটিতে এ পর্যন্ত ৭০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়।

এ ক্ষেত্রে, আগামী তিন মাস ক্ষতিগ্রস্তদের কোনো প্রকার বাড়িভাড়া দিতে হবে না এবং সরকার থেকে তাদের সাময়িক আবাসনের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানানো হয়। পরবর্তীতে ভূতিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি মেরামত বা পুনর্নিমাণের বিষয়েও তাদের সাহায্য করা হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে এখনও নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। কারণ, কলম্বিয়া প্রশাসন থেকে বর্তমানে বড় শহরগুলোর হতাহতের তথ্য সংগ্রহ করা হলেও এখনও দেশটির মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলের তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয় নি।

তবে, তিন হাজারেরও বেশি মানুষ বর্তমানে নিখোঁজ রয়েছে এবং তারা ধসে পড়া ভবনগুলোর ভেতর আটকা পড়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভূমিকম্পে দেশটিতে এ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৬০০ এর মতো ভবন ধসে পড়েছে বা পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। 

বর্তমানে কলম্বিয়ার সেনাবাহিনী, জরুরি উদ্ধারকর্মী দলসহ ভবনগুলোর মধ্যে আটকে পড়াদের স্বজনরা উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছে। ডজনেরও বেশি নগর ও শহরগুলোতে উদ্ধার কাজে নিয়োজিতরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে হাতে হাতেই ভবনের ভেঙ্গে পড়া কংক্রিটের চাঁই সরিয়ে আটকে পড়াদের উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে, ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বিবেচনায় ক্যালি, পেরেইরা, ম্যানিজালেস ও কুইম্বদো শহরে এখনও রেড অ্যালার্ট জারি রয়েছে। কারণ, শুধু এ শহরগুলোতেই কমপক্ষে ১৬৫টি ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে। কলম্বিয়ার পশ্চিমের এ অংশের বিভিন্ন শহরগুলোর হাসপাতাল, বিমানবন্দর ও যাতায়াত ব্যবস্থার মতো জনসেবাগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কর্মীদের সঙ্গে উদ্ধারকাজে সাহায্য করেছে স্থানীয়রাও।

তবে, ভূমিকম্পটির মূল কেন্দ্র ছিলো কলম্বিয়ার সবচেয়ে দরিদ্র ও জনবিচ্ছিন্ন এলাকা। নৌকা, উড়োজাহাজ বা জঙ্গলের ভেতরের পথ ছাড়া ওইসব এলাকায় পৌঁছানো সম্ভব নয়।

এর মধ্যে ভূমিকম্পে চলাচলের রাস্তা ও অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বর্তমানে যাতায়াত আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে, ভূমিকম্পটি আঘাত হানার মূল কেন্দ্রের প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে, সোমবার মূল ভূমিকম্পটি আঘাত হানার পর গতকাল পর্যন্ত ৭০টিরও বেশি আফটার শক অনুভূত হয়েছে বলে কলম্বিয়ার জিওলজিক্যাল সার্ভিস থেকে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড়টির মাত্রা ছিলো ৪ দশমিক ৮। এ ধারা আগামী কয়েক সপ্তাহ এমনকি মাস পর্যন্তও চলতে পারে বলে প্রতিষ্ঠানটি থেকে জানানো হয়েছে। 

ভূমিকম্পের এ ক্ষয়ক্ষতি সামলাতে এরইমধ্যে ১ কোটি ৫৫ লাখ ডলার সাহায্যের প্রস্তাব করেছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে, উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য তাদের কোপার্নিকাস স্যাটেলাইট সার্ভিস চালু করেছে ইউরোপিয় ইউনিয়ন (ইইউ)।

একইসঙ্গে, জার্মান রেড ক্রসের সাহায্যে প্রাথমিকভাবে ১ লাখ পাউন্ড অর্থ সাহায্যও পাঠানো শুরু করেছে ইইউ। এ ছাড়া, ইসরায়েল, মেক্সিকো, চিলি, আর্জেন্টিনা এবং এল সালভাদর থেকেও সাহায্যের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। 

ধসে পড়া ভবনের মধ্য থেকে জীবিত উদ্ধার করা হচ্ছে অনেককে।

উল্লেখ্য, শক্তিশালী এ ভূমিকম্পটি ভেনেজুয়েলার একাংশসহ ইকুয়েডর এবং পানামাতেও অনুভূত হয়। তবে, এর কেন্দ্রের গভীরতা ছিলো প্রায় ১০০ কিলোমিটার বা ৬২ মাইল।

সাধারণত ভূগর্ভের এতো গভীরে সংঘটিত কোনো ভূমিকম্পের প্রভাব ভূগর্ভের উপরিভাগে তুলনামূলকভাবে কম অনুভূত হয়। ফলে, এতো গভীরতাসম্পন্ন একটি ভূমিকম্পের প্রভাবে ব্যাপক পরিমাণ এ ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ভূতত্ত্ববিদদের মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। 

তাই, ভূমিকম্পটির এ অস্বাভাবিক গভীরতা, এর মাত্রা এবং সর্বোপরি এর সার্বিক প্রভাব বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্পেনের জিওলজিক্যাল অ্যান্ড মাইনিং ইন্সটিটিউটের ভূতাত্ত্বিক রাউল পেরেজ।

সূত্র : ডয়চে ভেলে, আল-জাজিরা, সিএনএন এবং বিবিসি।