ফিচার ও মতামত

এখন কি বিশ্বে অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় ভূমিকম্প বেশি হচ্ছে?

ফিচার ও মতামত ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১:৩০, ২৪ আগস্ট ২০২৬;  আপডেট: ০৩:০৭, ২৪ আগস্ট ২০২৬

এখন কি বিশ্বে অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় ভূমিকম্প বেশি হচ্ছে?

ভূমিকম্পের মাত্রা যদি ৬ বা তার বেশি হয়, তাহলে তা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ছবি : ইন্টারনেট।

মাত্র গত মাসেই ৭ মাত্রার বেশি তিন তিনটি ভূমিকম্পে কেঁপে উঠে ইন্দোনেশিয়, কলম্বিয়া এবং মেক্সিকো, যাতে দেশগুলোতে নিহত হয় শত শত মানুষ। এর আগে চলতি বছরের জুনে পর পর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলাকে।

ফলে, এ ধরনের বড় কোনো দুর্যোগ ক্রমাগতভাবে ঘটতে থাকলে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন সবার মনে দেখা দেয় - বর্তমানে কি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভূমিকম্প বেশি হচ্ছে?

এখানে কয়েক দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করে বর্তমান সময়ে সংঘটিত শক্তিশালী এসব ভূমিকম্পের কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হলো :

২০২৬ সালে ১০টি বড় ভূমিকম্পের ঘটনা 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভের (ইউএসজিএস) তথ্যমতে, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ২০ হাজারের মতো ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। দিনের হিসেবে এ সংখ্যা প্রায় ৫৫টি। তবে, এগুলোর অধিকাংশেরই তীব্রতা খুবই কম থাকায় আমরা তা অনুভব করতে পারি না। তবে, ভূমিকম্পের মাত্রা যদি ৬ বা তার বেশি হয়, তাহলে তা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

নিচে উল্লিখিত মানচিত্রে ২০২৬ সালের ১০টি বড় ধরনের ভূমিকম্পের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে গত জুনে ফিলিপাইনে সংঘটিত হয় সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পটি। ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভয়াবহ এ ভূমিকম্পে দেশটিতে ১০০ এরও বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটে। একই মাসে ভেনেজুয়েলায় মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে সংঘটিত ৭ দশকি ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার জোড়া ভূমিকম্পে দেশটিতে নিহত হয় ৬ হাজার ৩০০ এরও বেশি মানুষ। আর অতি সম্প্রতি অর্থাৎ গত জুলাইয়ে মেক্সিকোতে এবং চলতি আগস্টে কলম্বিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় সংঘটিত সবগুলো ভূমিকম্প ছিলো ৭ দশমিক ৪ বা তারও বেশি মাত্রার।

গত ১০ বছরের ভূমিকম্পের অবস্থা এবং ২০২৬ সালের তুলনামূলক চিত্র

২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রতি বছর বিশ্বে ৬ বা তার বেশি মাত্রার গড়ে ১৩৩টি ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। এর মধ্যে ২০২৪ সালে হয় সর্বনিম্ন ৯৯টি এবং ২০২২১ সালে সর্বাধিক ১৫৭টি।

আর শুধু চলতি বছরের আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্তই বিশ্বব্যাপী ৬ বা তার বেশি মাত্রার ৯১টি ভূমিকম্পের ঘটনা রেকর্ড করা হয়, যার মধ্যে আবার ৭ মাত্রার বেশি ছিলো ১১টি। স্বাভাবিকভাবেই এ সংখ্যা গত শতকের তুলনায় কিছু হলেও বেশি। তারপরও একে স্বাভাবিক মাত্রাই বলতে হয়; কারণ, এর মধ্যে কোনোটিই ৮ বা ৯ মাত্রা পর্যন্ত পৌঁছেনি, যা সবচেয়ে ভয়াবহ ধরনের ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত।

তবে, একটি ভূমিকম্প কতোটা বিধ্বংসী হবে তা যতো না এর মাত্রা তারচেয়ে বেশি নির্ভর করে এটি কোথায় আঘাত করলো, তার উপর। অর্থাৎ, রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পটির মাত্রা কতো ছিলো, এর থেকেও বেশি জরুরি বিষয় হলো - এর গভীরতা, আঘাত করার স্থান (গ্রাম, শহর, নগর বা প্রত্যন্ত এলাকা) এবং ওই এলাকার ভবনগুলোর ভূমিকম্প সহ্য করার সক্ষমতার উপর। ফলে এ হিসেবে, গত শতকে সংঘটিত ভূমিকম্পগুলো তেমন বিধ্বংসী ছিলো না। বরং,  একদম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আঘাত হানা ভূমিকম্পগুলো ছিলো তুলনামূলক বেশি বিধ্বংসী।

‘ভূমিকম্পের সিজন’ বলতে কি আসলেই কিছু আছে?

না। কোনো রেকর্ডেই এমনটি কখনো দেখা যায় নি যে, কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে ভূমিকম্প বেশি সংঘটিত হয়। ইউএসজির মতে, বিজ্ঞানিরা এখনও পর্যন্ত কখন, কোথায় কি মাত্রার ভূমিকম্প সংঘটিত হবে, তার আগাম কোনো বার্তা আবিষ্কার করতে সক্ষম হননি।

কারণ, ভূমিকম্প সংঘটনের জন্য দায়ী কয়েক যুগ বা শতক ধরে গড়ে ওঠা  ফল্ট লাইন এবং টেকটোনিক প্লেটগুলো কখনো ১২ মাসের কোনো চক্রের নিয়ম মেনে চলে না। এমনকি, বড় কোনো ভূমিকম্পের পর সংঘটিত আফটার শকগুলোও চলতে পারে পরবর্তী টানা কয়েক সপ্তাহ বা এমকি কখনো কখনো কয়েক মাস পর্যন্তও।

তবে, কিছু ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা সফল হয়েছেন। অর্থাৎ, কোনো নির্দিষ্ট স্থানে কোন সময় কোনো বড় ভূমিকম্প সংঘটিত হবে কিনা, এটা আগে থেকে নির্ধারণ করা সম্ভব না হলেও ভূতাত্ত্বিকরা এ সম্পর্কে ধারণা দিতে পারছেন যে, কয়েক বছরের মধ্যে কোন অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে, সে সব অঞ্চলের ভবনগুলোকে ভূমিকম্প সহনীয় করে নির্মাণ করা সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়াও, এখন বিজ্ঞানীদের পক্ষে কোথাও ভূমিকম্প শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে মানুষকে সতর্ক করার জন্য আগাম সতর্কবার্তা দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে।

ভূতাত্ত্বিকরা মূলত সিসমোগ্রাম দেখে ভূমিকম্পের মাত্রা ও অন্যান্য বিষয়গুলো সম্পর্কে জানতে পারেন।

ভূমিকম্প কিভাবে হয়?

সাধারণভাবে বলা যায়, ভূমির নিচের অংশ কেঁপে উঠলেই মাটির উপরিভাগে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। বিস্তৃতভাবে বলা যায় - ভূপৃষ্ঠের গভীরের স্তরগুলো মূলত পাজেলের মতো খণ্ড-বিখণ্ড। বহু খণ্ডে বিভক্ত এ অংশগুলো আবার সবসময় চলমান, যাকে বলা হয় টেকটোনিক প্লেট। এগুলো প্রায় ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত পুরু। এ প্লেটগুলো আবার একটি শক্ত পাথরের উপর বসে আছে, যা লাখ লাখ বছর ধরে টেকটোনিক প্লেটগুলোকে ধীরে ধীরে ধাক্কা দিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে।

ফলে, এ প্লেটগুলো সবসময়ই নড়ছে, কিন্তু এ ধারাবাহিকতায় প্রায়ই প্লেটগুলোর এক প্রান্ত আরেক প্রান্তের সঙ্গে আটকে যায়। তখন প্লেটগুলোর মধ্যে প্রচণ্ড চাপ বা শক্তি জমা হতে থাকে। এ অবস্থায় প্রচণ্ড শক্তির কারণে প্লেটগুলোর মধ্যে ফাটল দেখা দেয়, যাকে ফল্ট বলা হয়। আর, ফাটল দেখা দেওয়ার পরই প্লেটগুলো আবার আলাদা হয়ে যায়। এ প্রক্রিয়া মাটির গভীরে শত শত কিলোমিটার পর্যন্ত চলতে থাকে। এর মধ্যে কিছু ফল্ট খুব সহজে শনাক্ত করা গেলেও কিছু শুধুমাত্র ফাটল ধরার পরই শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

ভূমিকম্প কোথায় হয়?

পৃথিবীর সবচেয়ে ভূকম্পনপ্রবণ এলাকাকে বলা হয় প্যাসিফিক রিং অব ফায়ার। এটির কারণে বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। এর বেল্টটি পশ্চিম আমেরিকা থেকে রাশিয়ার পূর্বের দূরবর্তী অংশ হয়ে দক্ষিণপূর্ব এশিয়া এবং নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত। এর মধ্যে রয়েছে জাপান, ফিলিপাইন এবং ইন্দোনেশিয়াসহ আরও বেশ কয়েকটি দেশ।

তবে, রিং অব ফায়ারের বাইরেও ভূমিকম্প হয়ে থাকে। ইন্দোনেশিয়ার জাভা থেকে হিমালয় পর্ববমালার মধ্য দিয়ে তুরস্ক এবং ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত দ্য অ্যালপাইড বেল্টের কারণেও বিশ্বের মোট বড় ভূমিকম্পের ১৭ শতাংশ সংঘটিত হয়। এ ছাড়াও প্রাচীন কিছু ফল্টের কারণে কিছু ভূমিকম্প হয়ে থাকে, কিন্তু, এর সংখ্যা খুবই বিরল।

ভূমিকম্প কিভাবে পরিমাপ করা হয়?

মূলত, ভূমিকম্পের মাত্রার উপর নির্ভর করে এটি পরিমাপ করা হয়। অর্থাৎ, এর মধ্য দিয়ে ভূমকম্পের ফলে এর কেন্দ্র কতোটুকু শক্তি বাইরে বের করে (অবমুক্ত করা), তা পরিমাপ করা হয়। এ মাত্রা আবার নির্ভর করে লাগারিদম স্কেলের উপর। অর্থাৎ, এই স্কেলে প্রতি এক ঘর মান বাড়লে ১০ গুণ বেশি কম্পন হওয়া এবং প্রায় ৩২ গুণ বেশি শক্তি বেড়ে যাওয়াকে বোঝায়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রিখটার স্কেলে ৪ থেকে ৪ দশমিক ৯ মাত্রার কোনো ভূমিকম্পকে মৃদু বলা হলেও এর ফলে কিছু ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। অন্যদিকে, ৫ মাত্রার ভূমিকম্পে ৪ মাত্রার তুলনায় ১০ গুণ বেশি কম্পন অনুভূত হয় এবং ৩২ গুণ বেশি শক্তি অবমুক্ত হয় এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও তুলনামূলক একটু বেশি হয়।

রিখটার স্কেলে ৬ মাত্রার ভূমিকম্প মানে এটি ৪ মাত্রার তুলনায় ১০০ গুণ বেশি কম্পন তৈরি করে এবং ১ হাজার গুণ বেশি শক্তি অবমুক্ত করে। আবার, ৭ মাত্রার ভূমিকম্পকে সাধারণত বেশ বড় আকারের ভূমিকম্প বলে বিবেচনা করা হয়। কারণ, এর ফলে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটাসহ ভবন ও অবকাঠামোগত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

আর, রিখটার স্কেলে ৮ বা তারচেয়ে বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হচ্ছে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ধরনের ভূমিকম্প। এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে একটি বিশাল এলাকা প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস্তূপে পরিণত হতে পারে।

অর্থাৎ, রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা, ভূমিকম্প হওয়ার স্থান, ওই স্থানের ভূমির গঠন এবং ভূমিকম্পের আঘাতে সুনামি বা ভূমিধসের মতো দ্বিতীয় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো ঘটনাগুলোই মূলত নির্ধারণ করে একটি ভূমিকম্প কতোটা ভয়ঙ্কর ও বিধ্বংসী হবে।

এ পর্যন্ত সংঘটিত সবচেয়ে বড় ভূমিকম্পের রেকর্ড কি?

মানব জাতির ইতিহাসে এ পর্যন্ত জানা সবচেয়ে বিধ্বংসী ভূমিকম্পটি সংঘটিত হয় ১৯৬০ সালের ২২ মে, চিলির ভালদিভিয়ায়। ৯ দশমিক ৫ মাত্রার ভয়াবহ এ ভূমিকম্পের প্রভাবে ওই এলাকায় প্রশান্ত মহাসাগরের মতো প্রশস্ত সুনামির সৃষ্টি হয়।

এর মাত্র ৪ বছর পরই আলাস্কার প্রিন্স উইলিয়াম সাউন্ড নামের অঞ্চলে বিশ্বের দ্বিতীয় শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিলো ৯ দশমিক ২।

২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর সুমাত্রার উপকূলীয় অঞ্চলে ৯ দশমিক ১ থেকে ৯ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর প্রভাবে সংঘটিত সুনামিতে ভারতীয় মহাসাগরীয় এলাকায় ২ লাখ ২৮ হাজারের মতো প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। 

সূত্র : আল-জাজিরা।