ফিচার ও মতামত

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র কেন ইরানে হামলা করেছে

কতোদিন চলবে এ সংঘাত

ফিচার ও মতামত ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩:৩১, ৬ মার্চ ২০২৬

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র কেন ইরানে হামলা করেছে

সংঘাতের প্রচণ্ডতা মধ্যপ্রাচ্যের সীমা ছাড়িয়ে এশিয়া অঞ্চলের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার জের ধরে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। যৌথ এ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাকে এরইমধ্যে হত্যা করেছে যৌথ বাহিনী। 

খুব দ্রুত এ সংঘাতের ব্যাপ্তি বাড়ছে, যা এখন লেবানন ও সাইপ্রাস পর্যন্ত চলে এসেছে। কিন্তু, সংঘাত বন্ধের কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। 

বরং, গতকাল বৃহস্পতিবার সংঘাতের ষষ্ঠ দিনও হামলা পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। পাল্টাপাল্টি এসব হামলায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এ পর্যন্ত প্রাণ গেছে ১ হাজার ২৩০ জনের।

গতকাল ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তেহরানের একটি স্টেডিয়াম। একইসঙ্গে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কেন্দ্রে হামলার দাবি করেছে ইসরায়েল।  

এ অবস্থায় তারা যুদ্ধের পরবর্তী ধাপে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বলে গতকাল ইসরায়েলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তারা ইরান রাষ্ট্র ও এর সেনা সক্ষমতা দুর্বল করতে কাজ করবে বলে জানায় দেশটির সেনা প্রধান।

অন্যদিকে, ক্রমাগতভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। এর মধ্যে ৬টি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা সম্ভব হলেও একটি দেশের ভেতরে এসে পড়েছে বলে ইউএই জানিয়েছে। এতে বেশ কয়েকজনের হতাহতের খবর পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া, কাতার ও বাহরাইনেও বোমা বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। সংঘাতের প্রচণ্ডতা মধ্যপ্রাচ্যের সীমা ছাড়িয়ে এশিয়া অঞ্চলের দিকে ধাবিত হচ্ছে বলেও খবর পাওয়া গেছে।

শ্রীলঙ্কার কাছে অবস্থিত একটি টর্পেডোতে যুক্তরাষ্ট্র হামলা করেছে বলে অভিযোগ করেছে ইরান। অন্যদিকে, আজারবাইজানের একটি বিমানবন্দরে ইরান ড্রোন হামলা করেছে বলে দেশটির তরফ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে ।

এর উপর্যুক্ত জবাব দেওয়া হবে বলে দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে, আজারবাইজানে ড্রোন হামলার অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে ইরান।

এদিকে, এ সংঘাতে জড়িয়ে পড়া নিয়ে সতর্ক অবস্থানে থেকেও শেষ পর্যন্ত রেহাই পায় নি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। সাইপ্রাসে আক্রমণের পর এরইমধ্যে দেশটির নিরাপত্তা জোরদার করেছে ইতালি ও গ্রিস।

অন্যদিকে, প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে কাতারে চারটি যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছে যুক্তরাজ্য। এ অবস্থায় মার্কিন দূতাবাসের নিকটবর্তী এলাকা থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে হয়েছে কাতারকে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ ছাড়া অন্যান্য কাজে একটি সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে ফ্রান্স। তবে, এখনও এ সংঘাতে সরাসরি অংশ নেওয়ার বিষয়ে দ্বিধায় রয়েছে দেশটির নেতারা। 

ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম ইরানে ব্যাপক পরিসরে হামলা চালায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় দেশ দুটি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানাসহ সেনা ঘাঁটি এবং গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের লক্ষ্য করে হামলা চালাতে থাকে।
 
এ হামলার প্রথম দফাতেই নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়তুল্লাহ আলি খামেনি। তিনি ১৯৮৯ সাল থেকে দেশটির নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন।

এছাড়াও এ হামলায় ইরানের ক্ষমতাশালী ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ডজনেরও বেশি জেষ্ঠ্য নেতা নিহত হন বলে দাবি করে ইসরায়েল। এর মধ্যে কমান্ডর-জেনারেল এবং ডিফেন্স কাউন্সিল সেক্রেটারির কথা উল্লেখযোগ্য।

সপ্তাহজুড়েই ইরানের রাজধানী তেহরান এবং নৌ বাহিনীর বিভিন্ন যান এবং স্থাপনাসহ অন্যান্য স্থানেও হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র।

এর মধ্যে শনিবার হামলার প্রথম দিন যৌথ বাহিনী ইরানের দক্ষিণাংশে আইআরজিসি এর ঘাঁটির প্বার্শবর্তী একটি স্কুলে প্রাণঘাতি হামলা চালায়। এ হামলায় ১৬০ জনেরও বেশি  নিহত হয়েছে বলে অভিযোগ করে ইরান।

তবে, এ এলাকায় সেনা হামলার বিষয়টি অস্বীকার করেছে ইসরায়েল। যুক্তরাষ্ট্রও কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে গেছে। 

তবে, স্কুল ছাড়াও যৌথ বাহিনী এ পর্যন্ত ৯টি হাসপাতালে হামলা করেছে বলে অভিযোগ করে ইরান। কিন্তু, তারা হাসপাতাল নয় বরং প্বার্শবর্তী সেনা ক্যাম্প লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিলো বলে দাবি করে ইসরায়েল। 

তবে, তেহরানের একটি হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি জানতে পেরেছে বলে গত রবিবার স্বীকার করে ইসরায়েল।

এদিকে, যৌথ বাহিনীর এ হামলায় এ পর্যন্ত মোট ৭৮৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে ইরানভিত্তিক রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে। অন্যদিকে, এ হামলায় এ পর্যন্ত ১ হাজার ১০০ ইরানি নাগরিক নিহত হয়েছে এবং এর মধ্যে ১৭৬ জনই শিশু বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিটস ইন ইরান (এইআরএএনএ)।

বর্তমানে ইরানের ইন্টারনেট সংযোগ কঠোরভাবে সীমিত করা হয়েছে এবং আকাশপথ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।   

এ অবস্থায় ইরানে সরাসরি স্থল হামলা হলে তারাও পাল্টা জবাব দিবে বলে জানিয়েছে দেশটি। তারা প্রস্তুত এবং যেকোনো হামলা ঠেকাতে সক্ষম বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস রাঘচি। 

এক্ষেত্রে, ইরান যুদ্ধবিরতি চায় না এবং তাদের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনারও কোনো ইচ্ছা নেই বলে দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়। কারণ, তারা দু’বার এ চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবারই আলোচনার মাঝপথে তাদের দেশে হামলা করেছে বলে সমালোচনা করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

এ অবস্থায় খামেনিকে হত্যা করা ছাড়া এ সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র আর কোনো সফলতা দেখাতে পারেনি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তবে, এখনই সরাসরি স্থল হামলার পরিকল্পনা না থাকলেও বিষয়টি পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়া হয়নি বলে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে। এ ক্ষেত্রে কুর্দি বাহিনীকে শক্তিশালী করে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে একটি বিপ্লব ঘটানোর চেষ্টা করতে পারে বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে খবর পাওয়া যাচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে ইরাকের সীমান্তবর্তী এলাকার নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ দিয়েছে ইরান।

ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কেন এ হামলা?

অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ হামলা করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের মতে - তারা জানতো ইসরায়েল ইরানে আঘাত করতে যাচ্ছে, এ অবস্থায় এ অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরানের হামলার আশঙ্কায় আগেই হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে, ইসরায়েলের যুক্তি হলো - তারা সব হুমকি ব্যর্থ করে দিতে এ হামলা চালিয়েছে।

তবে, এ সময় সেনা হামলারই কেন প্রয়োজন ছিলো- এর কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি ইসরায়েল। অন্যদিকে, ইরানিদের মার্কিন মুল্লুকে হামলার যে দাবি যুক্তরাষ্ট্র করেছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে তার প্রমাণ দেখানোর দাবি জানিয়েছেন দেশটির বেশ কয়েকজন আইনজীবী। 

তবে, বাস্তবতা হচ্ছে এসব যুক্তের আড়ালে রয়েছে আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ। আর, এ হামলা যে হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্তে হয় নি, বরং এর পেছনে যে রয়েছে দীর্ঘ দিনের পরিকল্পনা, সেটিও জানিয়েছেন ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র।
 
১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পর থেকেই দেশটির চরম শত্রুতে পরিণত হয় ইসরায়েল ও এর মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। কারণ, সে সময় ইরানের নেতৃত্ব ক্রমাগতভাবে দেশ হিসেবে ইসরায়েলের বিলুপ্ত চেয়ে আসছিলো। একইসঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রকে শত্রু দেশ হিসেবেও অ্যাখ্যা দেয় ইরান।

অন্যদিকে, ইরানের পরমাণু কর্মসূচী নিয়ে পশ্চিমাদের যে বিরোধিতা, এর মূলে ছিলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল জোট। তাদের দাবি ছিলো – এ কর্মসূচীর আড়ালে পরমাণু বোমা তৈরির কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। কিন্তু, প্রতিবারই পশ্চিমা এ অভিযোগ তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করে দেশটি।

এ অভিযোগের মধ্যেই ২০২৫ সালের জুন মাসে ইরানের পরমাণু ও সেনা স্থাপনায় হামলা চালায় ইসরায়েল। এ সংঘাত ১২ দিন স্থায়ী হয়। 

কিন্তু, এর পর থেকেই ইরান আবারও পরমাণু কর্মসূচী শুরু করেছে বলে অভিযোগ করতে থাকে ইসরায়েল। একইসঙ্গে, পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্রও তৈরি করছে বলে অভিযোগ করা হয়।

এদিকে, ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের এ ক্ষেপণাস্ত্র যেকোনো দিন যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানবে। তবে, খোদ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার পর্যালোচনাতেই এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায় নি।

অন্যদিকে, ইসরায়েলের তরফ থেকে ইরান তাদের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি; আর, এ কারণেই তারা চায় ইরানের পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচী পুরোপুরিভাবে বিনষ্ট করতে। তবে শুধু তাই নয়, বরং, দীর্ঘমেয়াদী নিশ্চয়তার জন্য ইরানের সরকার বদল করাও ইসরায়েলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।

এ অবস্থায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইরানে সংঘটিত হয় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ। এ সময় দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী আন্দোলনকারীদের উপর ব্যাপক দমন-পীড়ন চালায়। এতে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে। 

এ ঘটনার পরই প্রথমবারের মতো ইরানে হামলা চালানোর বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলে যুক্তরাষ্ট্র। তবে, এর পরিবর্তে পরিস্থিতি সামলাতে প্রথমে আলোচনা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। 

প্রাথমিকভাবে এ আলোচনা সফল হচ্ছিলো বলেই ধারণা করা হয়। কিন্তু, হঠাৎ করেই ট্রাম্প জানান যে, আলোচনার ধরন নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট নন। আর, এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।

কিভাবে এ হামলার প্রতিক্রিয়া দেখায় ইরান?

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এ হামলাকে ‘অপ্রয়োজনীয়, অবৈধ ও অনুচিত’ বলে অভিহিত করেছে ইরান। ফলে, এর জবাবে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ব্যাপকভাবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো শুরু করে দেশটি। 

এর অংশ হিসেবে ইরানের সশস্ত্র বিপ্লবী গোষ্ঠী (আইআরজিসি) ইসরায়েলের তেল-আবিবসহ অন্যান্য শহরে থাকা সরকারি ও সেনা স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালায়। 

এ ছাড়া, মধ্যপ্রাচ্যের কাতার, বাহরাইন, জর্ডান, সংযুক্ত আরব-আমিরাত (ইউএই) এবং কুয়েতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। একইসঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ হিসেবে পরিচিত ওমান এবং সৌদি আরবেও হামলা চালায় ইরান।

তবে, বর্তমানে সরকারি ও সামরিক স্থাপনা এবং ঘাঁটি ছাড়াও নৌযান, সৌদি আরবের রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস এবং দুবাইয়ের হোটেলের মতো জনসমাগমপূর্ণ স্থানেও হামলা চালানো শুরু করেছে দেশটি।

এ পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্র দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, ‘নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা এবং যে সব দেশ এর সঙ্গে জড়িত নয় শত্রুতার বশে সে সব দেশের উপর আক্রমণ করা চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো আচরণ।’

তবে, এর মধ্যেই সাইপ্রাসে থাকা ব্রিটেনের একটি সেনা ঘাঁটিতে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানায়। এদিকে, এ হামলারর জন্য ইরানকেই দায়ী করে সাইপ্রাস।

এদিকে, কুয়েতের বিমান বাহিনী ভুলবশত তিনটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করলেও গত সোমবার ইরানি হামলায় ৬ মার্কিন সেনা নিহত ও আরও প্রায় ১৮ জন আহতের খবর পাওয়া যায়।

এ অবস্থায় বাহরাইন, মিসর, ইরান, ইরাক, ইসরায়েল, ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর ও গাজা, জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, ওমান, কাতার, সৌদি আরব, ইউএই এবং ইয়েমেনে অবস্থানরত সব মার্কিন নাগরিকদের দ্রুত নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানায় দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। 

লেবাননের বর্তমান পরিস্থিতি কি?

ইরানে হামলার জের ধরে এরইমধ্যে লেবাননেও হামলা শুরু করেছে ইসরায়েল। বৈরুতসহ দেশটির দক্ষিণের কিছু অংশে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। তবে, লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র দল হিজবুল্লাহ তেল-আবিবে রকেট হামলা চালানোর পরই তারা পাল্টা হামলা চালায় বলে দাবি করে ইসরায়েল।

হিজবুল্লাহ মূলত ইরানে মিত্র হিসেবে পরিচিত। আর, তারা ইরানের নেতা খামিনির মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতেই ইসরায়েলে হামলা চালায় বলে স্বীকার করে।

তবে, হিজবুল্লাহর হামলা ঠেকাতে ইসরায়েল লেবাননে সৈন্য পাঠাতে যাচ্ছে বলে গত মঙ্গলবার ইসরায়েলের প্রতিরক্ষমন্ত্রী জানান। তারা দেশটিতে থাকা হিজবুল্লাহর ঘাঁটি নিজেদের আয়ত্ত্বে নিতে যাচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

কিন্তু, মধ্যপ্রাচ্যে এ যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এ পর্যন্ত ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ তাদের বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে বলে জাতিসংঘ জানিয়েছে।

এ যুদ্ধ কিভাবে বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানির দামে প্রভাব ফেলছে?

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রভাব এরইমত্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে। 

পারস্য উপসাগরে থাকা নৌযানগুলোতে ইরান হামলা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, হরমুজ প্রণালী বন্ধেরও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি। 

এই হরমুজ প্রণালী হচ্ছে পারস্য উপসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রণালী যা ওমান উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ইরান এবং ওমানের নিয়ন্ত্রণাধীন গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের ২০ শতাংশ সরবরাহ করা হয়।

এ অবস্থায় প্রয়োজনে মার্কিন নৌবাহিনী এ অঞ্চলের নৌযানগুলোকে সুরক্ষা দিবে বলে গত মঙ্গলবার আশ্বস্থ করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

কিন্তু, এরপরও কুয়েতের বন্দরে নোঙ্গর করে রাখা তেলবাহী একটি জাহাজে ভয়াববহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে জাহাজটি ফেটে তেল ছড়িয়ে পড়ছে বলে গতকাল ব্রিটিশ সমুদ্র বিষয়ক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে।

এ ছাড়া, ওমান ও ইউএইর তেল ও গ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক বন্দর ও টার্মিনালে ইরান হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে। এ অবস্থায় বিশ্বের বড় বড় তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশগুলো তাদের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে।

অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে কাতার এরইমধ্যে তাদের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এনএলজি) উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করেছে। দেশের সবচেয়ে বড় জ্বালানি প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করেছে সৌদি আরবও।

এ অবস্থায় বাজারে তেল ও গ্যাসের দামে এরইমধ্যে উর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা গেছে। গত সোমবার ব্রেন্ট তেলের দাম ২০২৪ সালের জুলাই মাসের পর প্রথমবারের মতো ব্যারেল প্রতি ৮৫ ডলারে উঠে।

গত বুধবার এর দাম দাঁড়ায় ব্যারেল প্রতি ৮৩ দশমিক ৯৬ ডলার। এর মধ্য দিয়ে শনিবার থেকে এ পর্যন্ত পণ্যটির দাম ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে দেখা যায়। 

খামেনির উত্তরসূরী কে হতে যাচ্ছে?

খুব শিগগিরই সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করা হবে বলে জানিয়েছে ইরান।

বর্তমানে দেশ পরিচালনায় প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেস্কিয়ান, বিচার বিভাগের প্রধান ঘোলামহোসেইন মহসিনি এবং জেষ্ঠ্য মওলানা আলি রেজা আরাফির নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়েছে।

আনুষ্ঠানিকভাবে নেতা নির্বাচনে দেশটির ৮৮ জন জেষ্ঠ্য মওলানাদের নিয়ে গঠিত অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্ট চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। ইরানি সংবিধান অনুযায়ী এ জেষ্ঠ্য খতিবগণ যত দ্রুত সম্ভব দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা নির্বাচিত করবেন। 

কিন্তু, বর্তমানে দেশটিতে বর্তমানে যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করায় পুরো প্রক্রিয়াটির বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে, ইরানের সশস্ত্র বিপ্লবী দল আইআরজিসি এরইমধ্যে আহমেদ ভাহিদিকে তাদের দলের প্রধান হিসেবে নির্বাচিত করেছে।

এদিকে, খামেনির ছেলে মোজতোবা খামেনিকে ইরানের পরবর্তী নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হতে পারে বলে জানা গেছে। কিন্তু, গতকাল এ সম্ভাবনার বিষয়টি নাকচ করে দেন ট্রাম্প। এ ক্ষেত্রে খামেনিরি ছেলে এ দায়িত্বের অযোগ্য এবং ইরানের পরবর্তী নেতা নির্বাচনে তার পরামর্শ নেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

বর্তমানে এ অঞ্চল ভ্রমণ করা কি নিরাপদ এবং কতোদিন এ পরিস্থিতি চলবে?

চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ এ যুদ্ধ চলতে পারে বলে গত সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে, তাদের পক্ষে এরচেয়েও বেশি সময় ধরে তা চালিয়ে নেওয়া সম্ভব বলে জানান তিনি।

এর আগে, যতোদিন প্রয়োজন এ যুদ্ধ চলবে বলে গত শনিবার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেছিলেন।

এ পরিস্থিতি বর্তমানে বৈশ্বিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বড় বিপর্যয় ডেকে এনেছে। এরইমধ্যে বিশ্বের বহু দেশের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বিমান যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে, বাতিল হয়ে যাচ্ছে একের পর এক বিমানের ফ্লাইট। 

করোনা মহামারির পর এটিই এখন পর্যন্ত এক্ষেত্রে সবচেয়ে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি।

বর্তমানে দুবাই থেকে ইমিরাটসের মালবাহী কিছু উড়োজাহাজ চালু হয়েছে, কিন্তু, আরও অনেক যাত্রীবাহী বিমানের ফ্লাইট বাতিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ইমিরাটস এয়ারওয়েজ থেকে সরাসরি যোগাযোগ না করা পর্যন্ত যাত্রীদের বিমানবন্দরে যেতে বারণ করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আবুধাবিভিত্তিক এয়ারওয়েজ ইতিহাদের সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়।

তবে, শেষ পর্যন্ত দুবাই ও আবুধাবি থেকে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশে সীমিতভাবে কিছু ফ্লাইট চালু করেছে ইমিরেটস ও ইতিহাদ। ফলে, মধ্যপ্রাচ্যে আটকে পড়া অনেকেই এ অঞ্চল ছেড়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। 

কিন্তু, ফ্লাইটের সংখ্যা অপ্রতুল হওয়ায় অনেকের পক্ষেই নিজ দেশে ফেরা সম্ভব হচ্ছে না। বাণিজ্যিক ফ্লাইটগুলো এখনও বাতিলই রয়ে গেছে। 

এদিকে, বিমান চলাচলের পথ বন্ধ করে দেওয়ায় আন্তর্জাতিক সব ফ্লাইট বাতিল করেছে কাতার। তবে, আটকে পড়া যাত্রীদের মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে পৌঁছে দিতে গতকাল ফ্লাইট চালুর ঘোষণা দিয়েছে দেশটি।

এ ছাড়া, মধ্যপ্রাচ্যে আটকে পড়া যাত্রীদের দেশে ফিরিয়ে আনতে বিমান ভাড়া করেছে যুক্তরাজ্য। বিমানটি ওমান থেকে দুবাইয়ে আটকে পড়া যাত্রীদের নিয়ে ব্রিটেনে ফিরে যাবে বলে জানা গেছে।

সূত্র : বিবিসি, সিএনএন, ডয়চে ভেলে, আল-জাজিরা।