অন্যান্য

জাপানের কুমামুটুতে শক্তিশালী ভূমিকম্পের আঘাত

বহু হতাহতের আশঙ্কা

প্রকাশিত: ২৩:৫৪, ২৮ জুলাই ২০২৬;  আপডেট: ০৩:৫৬, ২৯ জুলাই ২০২৬

জাপানের কুমামুটুতে শক্তিশালী ভূমিকম্পের আঘাত

ভূমিকম্পে কাশিমা শহরের এ শপিংমলটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেকে হতাহত হয়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ছবি : ডয়চে ভেলে।

জাপানের দক্ষিণের কেয়ুশু দ্বীপের কুমামুটুতে ৭ দশমিক ১ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। আজ মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বিকাল প্রায় সাড়ে চারটার দিকে ভূমিকম্পটি আঘাত করে। এতে বহু হতাহতের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিলো ইউকি শহরে। এটি কুমামুটু শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। ভূমিকম্পটির কেন্দ্রের গভীরতা ছিলো ১০ কিলোমিটার। 

শক্তিশালী এ ভূমিকম্পটি কুমামুটু ছাড়াও প্বার্শবর্তী নাগাসাকি, কাগোশিমা, ফুকুওকা, সাগা এবং মিয়াজাকিতেও ব্যাপকভাবে অনুভূত হয় বলে দ্য জাপান টাইম নামের সংবাদমাধ্যম জানায়।

ভূমিকম্পে কুমামুটুর একটি শপিংমল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এর ভেতর অনেকে আটকা পড়েছে বলে জাপানের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এনএইচকে জানিয়েছে। এর আগে, কাশিমা শহরে একটি শপিংমলে বিস্ফোরণের খবর দেয় পুলিশ।

এ অবস্থায় এরইমধ্যে কমপক্ষে ৫০ জনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে বলে এনএইচকে থেকে জানানো হয়। এদের মধ্যে ১০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। এ ছাড়া, ভূমিকম্পে একটি উচ্চগতিসম্পন্ন ট্রেন লাইনচ্যুত হয়েছে। এতে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পরিস্থিতি বিবেচনায় বর্তমানে শিনকানসেন বুলেট ট্রেনসহ কেয়ুশুর অন্যান্য স্থানীয় ট্রেন চলাচল আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে, নিরাপত্তার স্বার্থে আসো কুমামুটু বিমানবন্দর বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।

ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত কেয়ুশু এক্সপ্রেসওয়ে। ছবি : আল-জাজিরা।

এদিকে, প্রাথমিকভাবে বহু মানুষ হতাহতের আশঙ্কা করা হচ্ছে বলে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে, ভূমিকম্পে অনেক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াসহ বহু স্থানে আগুন ধরে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এখনও হতাহতের পুরো সংখ্যা এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানার চেষ্টা করছি। তবে, এখন পর্যন্ত আমার কাছে যতো তথ্য এসেছে, তাতে ধারণা করা হচ্ছে এতে অনেক মানুষ  আহত হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বেশ কিছু জায়গায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, কোথাও কোথাও আগুন লাগার ঘটনাও ঘটেছে। এ ছাড়া, অনেক জায়গায় রাস্তাঘাট, সেতু এবং ভবন ধসে পড়েছে।’

এ অবস্থায় একই বা কাছাকাছি মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্পের বিষয়ে সতর্ক থাকতে জনগণকে আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

এদিকে, ভূমিকম্পের পর প্রাথমিকভাবে সুনামি সতর্কতা জারি করা হলেও পরে তা ওঠিয়ে নেওয়া হয়। মূলত, ভূমিকম্পটি দেশের অভ্যন্তরে আঘাত হানায় আপাতত সুনামির আশঙ্কা নেই বলে জাপানের আবহাওয়া দফতর থেকে জানানো হয়েছে। ফলে, খুব দ্রুতই সতর্কতা ওঠিয়ে নেওয়া হয় বলে জানানো হয়।

তবে, ভূমিকম্পটি আঘাত হানার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ বাসিন্দাকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যেতে বলা হয়েছে বলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা থেকে জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে, উদ্ধারকাজে সাহায্যের জন্য শত শত সেনা সদস্যকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

নিপ্পন পেপার ইন্ডাস্ট্রির এ কারখানাটির চিমনি ধসে অনেকে নিখোঁজ রয়েছে। ছবি : বিবিসি।

এদিকে, শক্তিশালী এ ভূমিকম্পটি আঘাত হানার পর থেকে এ পর্যন্ত ১ থেকে ৪ মাত্রার কমপক্ষে আরও প্রায় ৬০টি আফটার শক অনুভূত হয়েছে। তবে, জাপানের পারমাণবিক কেন্দ্র থেকে এখনও ক্ষয়ক্ষতির কোনো তথ্য পাওয়া যায় নি। 

কিন্তু, ভূমিকম্পের প্রভাবে ওই অঞ্চলে বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যাহত হয়েছে। বর্তমানে কুমামুটুর প্রায় ৪৫ হাজারের মতো বাড়ি বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে বলে কেয়ুশুর বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়। 

এ ছাড়া, কুমামুটুর এয়োন নামের শপিংমলের ভেতর অনেকে আটকে পড়েছে বলে দমকল সংস্থা থেকে জানানো হয়েছে। এ ঘটনায় নিখোঁজের সঠিক সংখ্যা সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায় নি। তবে, শপিংমলটির ২০ থেকে ৩০ জন কর্মী নিহত হয়ে থাকতে পারে বলে এনএইচকে থেকে জানানো হয়।

এদিকে, ভূমিকম্পের পর শপিংমলটি থেকে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং ধোঁয়া বের হতে দেখা যায় বলে এক প্রত্যক্ষদর্শী জানায়। একইসঙ্গে, শপিংমলের উপরের তলা ধসে পড়ে এবং বেশ কয়েকজন ক্রেতাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় বলে জানানো হয়।

পরে, জাপানের অগ্নি ও দুর্যোগ ব্যবস্থানা সংস্থা থেকেও উপরের তলা ধসে পড়া এবং বহু মানুষের শপিংমলের ভেতরে আটকে পড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

এ ছাড়া, কুমামুটুর একটি কাগজ তৈরির কারখানার চিমনি ধসে পড়ে অনেকে নিখোঁজ রয়েছে বলেও সংবাদমাধ্যমটি জানায়। বর্তমানে পুলিশ ও দমকল কর্মী নিপ্পন পেপার ইন্ডাস্ট্রির এ কারখানাটি অনুসন্ধানে সেখানে অবস্থান করছে। কারখানাটি কুমামুটু জেলার ইয়াটসুশিরু শহরে অবস্থিত।

এদিকে, ভূমিকম্পে কুমামুটুতে অবস্থিত ১৭ শতকের একটি রাজপ্রাসাদের দেয়াল কেঁপে ওঠে। ওই অঞ্চলেরই একটি পদচারী সেতুও ধসে পড়ে। তবে, এতে হতাহতের বিষয়ে এখনও নিশ্চিত কোনো খবর পাওয়া যায় নি। বর্তমানে এর পাশের বিকল্প একটি রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলাচল করছে।

ভূমিকম্পে কুমামুটু রাজপ্রাসাদের একটি দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ছবি : বিবিসি।

উল্লেখ্য, জাপান দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরের ‘রিং অব ফায়ার’ এর পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। এটি বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে সক্রিয় ভূকম্পনজনিত এলাকা, যেখানে প্রধান চারটি টেকটোনিক প্লেট একসঙ্গে মিলিত হয়েছে।

এ কারণে বর্তমানে প্রায় ১২৫ মিলিয়ন জনগণের এ দেশটিতে প্রতি বছর প্রায় একশোর মতো ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এটি পৃথিবীতে সংঘটিত মোট ভূমিকম্পের প্রায় ১৮ শতাংশ।

এ অবস্থায় দেশটির কুমামুটুতেও ভূমিকম্পের ঘটনা নতুন নয়। বরং, এখানেও প্রায়ই শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত করে। এর মধ্যে ২০১৬ সালে এ অঞ্চলে পর পর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়। এর মধ্যে প্রথমটির মাত্রা ছিলো ৬ দশমিক ৫ এবং দ্বিতীয়টির ৭ দশমিক ৩। 

প্রথম ভূমিকম্পটির মাত্র দুই দিন পর দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি সংঘটি হয়। ভয়াবহ এ বিপর্যয়ে সে সময় ২৭৩ জন নিহত ও ২ হাজার ৮০০ এরও বেশি মানুষ আহত হয়।

হাজার হাজার ভবন পুরোপুরি ধসে পড়ে বা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্য দিয়ে এটি জাপানের অতি সাম্প্রতিকতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিণত হয়।

সূত্র : বিবিসি, ডয়চে ভেলে, আল-জাজিরা।