এগিয়ে আসছে শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো
বিশ্বে এর কি প্রভাব পড়তে যাচ্ছে
জলবায়ু ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৩:৫৬, ২৪ জুন ২০২৬; আপডেট: ০১:১২, ২৫ জুন ২০২৬
২০২৪ সালে সৃষ্ট শেষ এল নিনোর প্রভাবে ফিলিপাইনে ভয়াবহ দাবদাহের সৃষ্টি হয়।
প্রশান্ত মহাসাগরে ক্রমেই গঠিত হচ্ছে শক্তিশালী এল নিনো। সামনের দিনগুলোতে এর প্রভাবে আবহাওয়ার ধরন ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়ে যাবে। আর এর মধ্য দিয়ে এটি এ শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো হতে চলেছে বলে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে।
গত ১৪০ বছরের মধ্যে এটি সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো হতে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের পরিবেশ বিজ্ঞানের অধ্যাপক পল রাওন্ডি।
খুব শিগগিরই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এর প্রভাব পড়তে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিইউএমও)। আগামী শীত পর্যন্ত এর প্রভাব বজায় থাকবে বলেও জানায় সংস্থাটি। এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আকারে খড়া, বন্যা, তাপ প্রবাহ দেখা দিবে।
ফলে, বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্য ও পানি সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটবে বলেডব্লিইউএমও থেকে সতর্ক করা হয়।
জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেস বলেন, ‘এ পরিস্থিতিকে বিশ্বের জরুরি জলবায়ু সতর্কাবস্থা বলে বিবেচনা করা উচিত। এল নিনো এরই মধ্যে বিদ্যমান বৈশ্বিক চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ায় আরও বিপর্যয় ডেকে নিয়ে আসবে।’
কি এই এল নিনো :
এল নিনো আবহাওয়ার বিশেষ একটি ধরন যা মূলত দুই থেকে সাত বছর পর পর দেখা দেয়। মূলত, প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণমন্ডলীয় এলাকার আয়ন বায়ু (এ বায়ু উত্তর গোলার্ধের উত্তর-পূর্ব দিক এবং দক্ষিণ গোলার্ধের দক্ষিণ পূর্ব দিক থেকে প্রবাহিত হয়) দুর্বল হয়ে পড়লে প্রশান্ত মহাসাগরে উষ্ণ বায়ুর একটি বলয় তৈরি হয়।
যদিও এ বলয় আকারে আমেরিকা মহাদেশের সমান এবং একটি অঞ্চলের একটি জায়গাতেই সীমাবদ্ধ থাকে, কিন্তু এর প্রভাব সারা বিশ্বেই অনুভব করা যায়।
নাসার গোদার্ড ইন্সটিটিউট ফর স্পেস এর পরিচালক গ্যাভিন স্মিড বলেন, ‘গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আবহাওয়া পরিবর্তিত হলে এর প্রভাব মধ্য-অক্ষরেখা পর্যন্ত অনুভূত হয়। তাই, আমরা এর থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থাকলেও একে গুরুত্ব দিতে আমরা বাধ্য। কারণ, এটি আবহাওয়ার এমন এক অবস্থা যাতে পুরো বিশ্বে একটি ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।’

বৈশ্বিক জলবায়ুতে এর কি প্রভাব পড়তে যাচ্ছে :
এল নিনোর প্রভাবে আবহাওয়া পরিস্থিতি অঞ্চলভেদে নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়। এর প্রভাবে যেখানে কোনো অঞ্চলে দেখা দেয় মারাত্মক খরা, একইসময় অন্য অঞ্চলে সৃষ্টি হয় বিপর্যয়কর বন্যা পরিস্থিতি।
এ ক্ষেত্রে এল নিনোর সময়গুলোতে মধ্য আমেরিকার কিছু অংশ, এশিয়া, আফ্রিকা এবং অস্ট্রেলিয়ায় প্রায়ই অতি উষ্ণ এবং শুষ্ক অবস্থা বিরাজ করে। এ সময় প্রয়োজনীয় পানির অভাব দেখা দেয়, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে দেখা যায় এসব অঞ্চলের কৃষি, জল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে, দেখা দেয় সুপেয় পানির অভাব।
এ অবস্থায় এবার হণ্ডুরাসের কমপক্ষে ৭৫টি পৌর এলাকায় ভয়াবহ খরা দেখা দিবে বলে সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ। এরইমধ্যে দেশটির রাজধানীতে পানির জন্য জরুরি সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে।
আবার, বিশ্বের অন্য অংশে এর ঝুঁকি বিপরীতমুখী। যেমন - দক্ষিণ আমেরিকার প্রশান্ত মহাসাগর সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় এল নিনোর প্রভাবে মুষলধারে বৃষ্টি এবং ভয়াবহ বন্যা দেখা দিবে। আর, এর প্রভাব হবে সুদূর প্রসারী।
কারণ, এল নিনোর প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক কৃষি খাতে, অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে শত শত কোটি ডলারে। ২০১৫-১৬ সালে সংঘটিত এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বের হাজার হাজার মানুষের খাদ্য সহায়তার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিলো।
এদিকে, বনাঞ্চলগুলোতে ব্যাপকহারে সংঘটিত দাবানলের ঘটনা বর্তমানে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় এল নিনোর প্রভাবে সৃষ্ট প্রচণ্ড দাবদাহ এবং খরার কারণে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অ্যামাজনের রেইনফরেস্টে দাবানলের ব্যাপক ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানিরা।

ঝড়, প্রবাল প্রাচীর এবং আন্টলান্টিকে ঘূর্ণিঝড়ের ঋতু :
গ্রীষ্মকালীন ঝড় সৃষ্টির ক্ষেত্রে এল নিনো একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এবার আটলান্টিকে ঘূর্ণিঝড়ের পরিমাণ সাধারণের তুলনায় কম হবে বলে বিজ্ঞানিরা জানিয়েছেন। মূলত, এল নিনোর কারণে আটলান্টিকে বায়ু প্রবাহের পরিমাণ বেড়ে যায়। এ অবস্থা সমুদ্রে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি এবং তা ঘনীভূত হওয়ার প্রবণতাকে কমিয়ে দেয়।
আবহাওয়া বিজ্ঞানি ব্রায়ান ট্যাং বলেন, ‘প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বের উষ্ণমন্ডলীয় এলাকার পানি গরম হতে শুরু করেছে। সাধারণত ঘূর্ণিঝড় হয়, এমন ঋতুতে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হলে এটি আটলান্টিকে মেঘ, বজ্রপাত, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এবং সাইক্লোনের সংখ্যা কমিয়ে দেয়।
তবে, তারপরও কিছু ঝড় যে একদমই বিপদজনক হবে না, সেটি বলা যায় না। কারণ, এর মধ্যে কিছু ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হবে এবং এগুলোকে দমিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। ফলে, এর প্রভাবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
কিন্তু, প্রশান্ত মহাসাগরের চিত্রটি আবার পুরোই উল্টো। কারণ, সেখানে বরং এল নিনোর প্রভাবের কারণেই অনেক বেশি ঝড় তৈরি হবে।
এদিকে, এল নিনোর কারণে সমুদ্রে চলাচলকারী জাহাজগুলোও বিপদের মধ্যে রয়েছে। কারণ, এর প্রভাবে সমুদ্রের তাপমাত্রা উত্তপ্ত হওয়ায় কোরাল ক্ষয়ের প্রবণতা বেড়েছে। এর ফলে সমুদ্র তলদেশের প্রবাল প্রাচীরগুলো বিপদজনক হয়ে উঠছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্রমেই বেড়ে চলা তাপপ্রবাহের কারণে এরইমধ্যে সমুদ্র তলদেশের প্রবাল প্রাচীর দুর্বল হতে শুরু করেছে। এর মধ্যে এল নিনো এ পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করলে তা জাহাজ চলাচলে ব্যাপক সমস্যার সৃষ্টি করবে।
এরইমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের কৃষি খাতেও এল নিনোর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ভারতে চলতি বছর আম উৎপাদনের পরিমাণ আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক কমে গেছে। আবহাওয়ার অস্বাভাবিক অবস্থার কারণে আমের গাছে সময়মতো মুকুল না আসায় পর্যাপ্ত ফলন হয় নি। এর ফলে সরবরাহে যেমন ঘাটতি দেখা দিয়েছে, তেমনি আম চাষীদেরও ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন কিভাবে এল নিনোর উপর প্রভাব ফেলছে :
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন এল নিনোকে আরও শক্তিশালী করছে কিনা, এর সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ এখনও বিজ্ঞানীদের হাতে নেই। তবে, এটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, জলবায়ু পরিবর্তন আবহাওয়ায় এল নিনোর প্রভাবকে আরও প্রকট করে তুলছে।
দ্য নাশনাল ওশ্যানিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের জৈষ্ঠ্য বিজ্ঞানি মাইকেল ম্যাকপেহডেন বলেন, ‘এল নিনোর কারণে সৃষ্ট খরা যতোটুকু বিপর্যয়কর হতো, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব একে তার থেকেও বেশি বিপর্যয়কর করে তুলছে।’
আবহাওয়া যতো উত্তপ্ত হবে, বাতাসে আদ্রতা ততো বাড়বে; এতে একইসঙ্গে বৃষ্টিপাত এবং তা থেকে বন্যার ঝুঁকিও ততোই বাড়বে। একইসঙ্গে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মাটির আদ্রতা কমে গিয়ে তা খুব দ্রুত শুষ্ক হয়ে যাবে, যা থেকে বাড়বে খরার প্রবণতা।
অর্থাৎ, বর্তমানে বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রায় রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে, এ অবস্থায় এল নিনো একে আরও বাড়িয়ে দিবে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দেশগুলো কি এল নিনোর প্রভাব মোকাবেলায় প্রস্তুত :
এল নিনোর ক্ষেত্রে একটি স্বস্তির বিষয় হলো এটি খুব ধীরে ধীরে গঠিত হয়। ফলে, পুরোপুরি বিপর্যয়কর অবস্থা সৃষ্টির অনেক আগে থেকেই এর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে, আবহাওয়ার সঠিক পূর্বাভাসের সাহায্যে ফসল রক্ষা করা, বন্যা প্রতিরোধে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া এবং আগাম পূর্বাভাস ব্যবস্থার উন্নতি করা সম্ভব।
বিজ্ঞানি ম্যাকপেহডেন এ বিষয়ে বলেন, ‘আমরা জানি যে এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বের কোন প্রান্তে এবার খরা দেখা দিবে এবং কোথায় বৃষ্টি ঝরবে। ফলে, দীর্ঘমেয়াদী পূর্বাভাসের সুবিধার কারণে হাতে পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যাবে। আর, এ সুবিধা কাজে লাগিয়ে এল নিনোর ভয়াবহ প্রভাব কমাতে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হবে।’
সূত্র : ডয়চে ভেলে।



