সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরান
রাজনীতি ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২:৪২, ৯ এপ্রিল ২০২৬; আপডেট: ০৩:৩৩, ৯ এপ্রিল ২০২৬
যুদ্ধবিরতি চুক্তির খবরে উল্লাসে মেতে উঠে ইরানি জনগণ। ছবি : আল-জাজিরা।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে ইরান। গতকাল বুধবার পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এ সংক্রান্ত একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়। এর মধ্য দিয়ে ইরানে ৪০ দিনের মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার আপাতত সমাপ্তি ঘটলো।
দেশ দুটির মধ্যে সম্পাদিত এ যুদ্ধবিরতি চুক্তির বিষয়টি ঘোষণা করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ সামাজিক মাধ্যম এক্সে লিখেন, ‘উভয় পক্ষই উল্লেখযোগ্য বিচক্ষণতা ও বিচারবুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে। একইসঙ্গে ভবিষ্যতেও এ শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ব্যাপারে গঠনমূলক অবস্থান নিয়েছে।’
যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় আগামী দুই সপ্তাহ সময়কালে হরমুজ প্রণালী দিয়ে আবারও তেল সরবরাহ চালু করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে ইরান। এ ক্ষেত্রে, খুব দ্রুত ও পুরোপুরিভাবে এটি খুলে দেওয়াসহ এর পরিবেশ নিরাপদ রাখবে বলে সম্মত হয় দেশটি।
ফলে, এ সময়কালে ইরানে কোনো ধরনের সেনা হামলা চালাবে না বলে সম্মত হয় যুক্তরাষ্ট্র। একইসঙ্গে, এ সময়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রতিপক্ষ ইরানে হামলা না চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইসরায়েল।
এদিকে, ইসরায়েল ও পারস্য উপসাগরীয় অন্যান্য দেশে কোনো ধরনের হামলা না চালানোর বিষয়ে সম্মত হয় ইরান। একইসঙ্গে, এ সময়ের মধ্যে কোনো ধরনের শত্রু ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা না চালানোর ঘোষণা দিয়েছে ইরাকভিত্তিক ইরান সমর্থিত সশস্ত্র দল দ্য ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক (আইআরআই)।
তবে, হরমুজ প্রণালির কার্যক্রম ইরানের সশস্ত্র বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করবে বলে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস রাঘচি জানান। একইসঙ্গে, এর মধ্য দিয়ে যাতায়াত করা জাহাজ থেকে ইরান এবং ওমান টোল আদায় করবে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এ টোল থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে ইরান দেশ পুনর্গঠনের কাজ করবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে, অস্থায়ী এ চুক্তির মধ্যেই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য এরইমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১০টি প্রস্তাব পাঠিয়েছে ইরান। দেশটির এ প্রস্তাবগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো - ইরান, ইরাক, লেবানন ও ইয়েমেনে যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ করা; ইরানের উপর থেকে সম্পূর্ণভাবে সব ধরনের অবরোধ তুলে নেওয়া; যুক্তরাষ্ট্রের বাজেয়াপ্ত ইরানের সব ধরনের অর্থ তহবিল ও সম্পদ অবমুক্ত করা এবং ইরানে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সামলাতে এবং অবকাঠামোগত পুনর্গঠনে যুক্তরাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দেওয়া।
একইসঙ্গে, ইরান কোনো ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না এবং এ বিষয়ে তারা পুরোপুরি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও আবারও নিশ্চিত করেছে দেশটি। এ বিষয়ে এক বিবৃতিতে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল বলে, ‘ইরানের এ বিজয় একমাত্র রাজনৈতিক আলোচনার মধ্য দিয়েই বজায় রাখা সম্ভব।’

এদিকে, ইরানের এ প্রস্তাবের বিষয়টি নিশ্চিত করে এর মধ্য দিয়ে সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনার একটি পথ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তবে, যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ইরান, সংযুক্ত আরব-আমিরাত ও কুয়েতে হামলার খবর পাওয়া গেছে। একইসঙ্গে, বুধবার স্থানীয় সময় সকালে লেবাননে হিজবুল্লাহদের ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইসরায়েল। এ ক্ষেত্রে, লেবানন যুদ্ধবিরতির আওতাভুক্ত নয় বলে দাবি করেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।
কিন্তু, ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির সময়কালে লেবাননের দক্ষিণাংশে হিজবুল্লাহদের লক্ষ্য করে হামলা থেকে বিরত থাকবে বলে যুদ্ধবিরতি চুক্তি ঘোষণার সময় উল্লেখ করেছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। মূলত, যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের সমর্থনে ইসরায়েলে হামলা শুরু করেছিলো লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র বিদ্রোহী দল হিজবুল্লাহ।
এ অবস্থায় যুদ্ধবিরতি চলাকালে উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে ও দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের উদ্দেশ্যে ইসলামাবাদে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধি দল। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও যুদ্ধ বন্ধে উভয় পক্ষের শর্তগুলো নিয়ে আলোচনা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আলোচনায় রাজি হওয়ায় উভয় পক্ষকে ধন্যবাদ জানিয়ে পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী শরীফ বলেন, ‘আমি উভয় দেশের বিচক্ষণতার জন্য তাদের সাধুবাদ জানাই এবং একইসঙ্গে আগামী ১০ এপ্রিল, শুক্রবার ইসলামাবাদে তাদের কূটনীতিকদের স্বাদর আমন্ত্রণ জানাই। আমি আশা করি, এ আলোচনার মধ্য দিয়ে উভয় দেশ বিদ্যমান সব বিরোধ মীমাংসা ও এর স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজে পাবে।’
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ক্রমাগত মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দেশটির অবকাঠামোগত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নিহত হন। এর পাল্টা জবাবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্রসহ ইসরায়েলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে ব্যাপকহারে হামলা চালাতে শুরু করে ইরান।
একইসঙ্গে আরব সাগরের গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয় দেশটি। এতে তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় রকমের বাধা সৃষ্টি হয়। ফলে, সারা বিশ্বে আশঙ্কাজনকভাবে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হওয়ার পাশাপাশি অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকে জ্বালানি তেলের দাম। কারণ, বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ এ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
সূত্র : আল-জাজিরা, সিএনএন।



