রাজনীতি

ন্যাটোর সদস্যপদ চেয়ে আবেদন করেছে সুইডেন ও ফিনল্যান্ড

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১৫:৪৫, ১৮ মে ২০২২;  আপডেট: ১৬:১৬, ১৮ মে ২০২২

ন্যাটোর সদস্যপদ চেয়ে আবেদন করেছে সুইডেন ও ফিনল্যান্ড

ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলায় নিরাপত্তা ইস্যুতে ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার কথা ভাবছে দেশদুটি। ছবি : এনপিআর ডট অর্গ।

ন্যাটোর সদস্য হতে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছে সুইডেন ও ফিনল্যান্ড। এ ঘটনায় ন্যাটোর মহাসচিব (সেক্রেটারি জেনারেল) ইয়েনস স্টলটেনবার্গ বলেছেন, 'এটি একটি ঐতিহাসিক সুযোগ যা আমাদের অবশ্যই কাজে লাগাতে হবে'। এ সময় তিনি আরও বলেন, নরডিক দেশগুলোর অন্তর্ভুক্তির মধ্য দিয়ে সদস্য দেশগুলোর নিরাপত্তা আরও বাড়বে।

বুধবার ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা বিবিসি-এর এক খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে।  

ইউরোপের এ দেশদুটি ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর সময় থেকেই ন্যাটোর সদস্য হতে তাদের আগ্রহের ব্যাপারে ইঙ্গিত দিয়ে আসছিলো। গত সপ্তাহে ফিনল্যান্ড তাদের আগ্রহের কথা স্পষ্টভাবে জানানোর পর গত শনিবার সুইডেনও পশ্চিমা এ নিরাপত্তা জোটে যোগদানের জন্য আবেদনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলো।

এদিকে ন্যাটোকে বরাবরই নিজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসা রাশিয়া দেশদুটির এ উদ্যোগের পরিণতি ভালো হবে না বলে আগেই সতর্ক করেছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছিলেন, দেশদুটির ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত 'ভুল' হবে। এ সময় ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগ দেওয়াই দেশটিতে হামলা চালানোর মূল কারণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি। অন্যদিকে, ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের এ সিদ্ধান্তকে সমর্থন করবে না জানিয়ে এর মধ্য দিয়ে দেশদুটি জঙ্গিবাদকে উস্কে দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছিলো তুরস্ক।

তবে ন্যাটোর সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার আগ পর্যন্ত এ প্রক্রিয়া চলাকালীন ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের জন্য সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা।

দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক কোনও সেনা জোটে যোগ না দিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থানে ছিলো সুইডেন। এখন ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তে দেশটির রাজনৈতিক নেতা ও জনসাধারণের অনেকের সমর্থন থাকলেও কেউ কেউ আবার এতে একমত হতে পারছেন না। তবে সুইডেনের ক্ষমতাসীন সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক দল এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ন্যাটোর সদস্যপদ চাইলেও তারা কোনও ধরনের পরমাণু অস্ত্রের ব্যবহার বা নিজ দেশে ন্যাটোর ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দেবে না।

এর আগে এক সংবাদ সম্মেলনে সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী ম্যাগদালিনা অ্যান্ডারসন বলেছিলেন, 'ন্যাটোতে যোগদান সুইডেন ও এর জনগণের নিরাপত্তার জন্য সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত বলে আমি ও আমার দল বিশ্বাস করি।' বর্তমান সময়ে বাল্টিক অঞ্চলের একমাত্র দেশ হিসেবে ন্যাটোতে যোগ না দিলে তা দেশ ও জনগণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সুইডেনের এ ঘোষণা হঠাৎ করে আসেনি। বরং দেশটির ন্যাটোতে যোগ দেওয়া সংক্রান্ত বিভিন্ন পরিস্থিতি যাচাই-বাছাইয়ের পরই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সুইডেন সরকার। মূলত গত শুক্রবার বিভিন্ন জরিপের তথ্য হাতে আসার পরই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। এ ক্ষেত্রে ন্যাটোতে যোগ দিলে ইউরোপের দক্ষিণাংশের নিরাপত্তা জোরদার হওয়াসহ এর ফলে রাতারাতিই রাশিয়াকে কোনও ধরনের আকস্মিক হামলা থেকে ঠেকিয়ে রাখা যাবে বলেও দেশটি মনে করেছে।

এ ছাড়া ইউক্রেনে রাশিয়া হামলা চালানোর পর সুইডেনের নাগরিকদের মধ্যেও ন্যাটোতে যোগদানের বিষয়ে আগ্রহ ধীরে ধীরে বাড়ছে। এমনকি বিরোধী রাজনৈতিক দলেরও অনেকে এ সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে ন্যাটোতে যোগদানের মধ্য দিয়ে রাশিয়াকে কোনও ধরনের হামলা থেকে নিশ্চিতভাবে ঠেকিয়ে রাখা যাবে বলে সবাই মনে করছেন না। আবার, ন্যাটোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে সুইডেনের এতোদিনের নিরপেক্ষ অবস্থানের অবসান ঘটা নিয়েও আফসোস রয়েছে কিছু নাগরিকের মধ্যে।

ফিনল্যান্ড ও রাশিয়া যৌথভাবে ১,৩০০ কিলোমিটার সীমান্ত দিয়ে ঘেরা। এতোদিন পূর্বাংশের এ প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে শান্তি বজায় রাখার জন্য ন্যাটোতে যোগ দেওয়া থেকে বিরত ছিলো ফিনল্যান্ড। কিন্তু সম্প্রতি দেশটির প্রেসিডেন্ট সাউলি নিইনিসতো ন্যাটোতে যোগ দিতে আবেদন করবেন বলে জানিয়ে একে 'ঐতিহাসিক দিন' বলে উল্লেখ করেন। তিনি এ বিষয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলোচনাও করেছেন বলে জানান। এ সময় প্রেসিডেন্ট সাউলি বলেছিলেন, 'আমি বা আমার দেশ লুকিয়ে কোনও কাজ করি না বা নীরবে সরে যেতে পছন্দ করি না।'

সুইডেন ও ফিনল্যান্ড ন্যাটোতে যোগদানের ব্যাপারে আগ্রহ জানানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলো তুরস্ক। তাদেরকে রাজি করাতে কোনও কূটনীতিক পাঠানোর চিন্তাও না করার হুঁশিয়ারি দেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান। তার মতে, দেশদুটি শুধু কুর্দি জঙ্গিদের সাহায্য করতেই আগ্রহী। সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি দেশদুটির এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে সুইডেনকে 'জঙ্গিবাদের আখড়া' হিসেবে উল্লেখ করেন। এ সময় এরদোগান বলেন, 'এ দুটি দেশের একটিরও জঙ্গি সংগঠন নিয়ে স্বচ্ছ কোনও অবস্থান নেই। আমরা কীভাবে তাদের বিশ্বাস করবো?'

সুইডেন ও ফিনল্যান্ড উভয় দেশই কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আসছে বলে বরাবরই অভিযোগ করে আসছে তুরস্ক। এ দলটিকে জঙ্গি দল হিসেবে বিবেচনা করাসহ দলটির প্রধান ফেতুল্লাহ গুলেন ২০১৬ সালে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় সরকার পতন চেষ্টার জন্য দায়ী বলেও অভিযোগ করে দেশটি। এ দলটির সঙ্গে তুরস্ক সরকারের বহু যুগ ধরে উত্তেজনা বিরাজ করছে। এদিকে সুইডেন ও ফিনল্যান্ড উভয় দেশেই কুর্দি জনগোষ্ঠী রয়েছে এমনকি সুইডেনের অনেক সংসদ সদস্যও কুর্দি বংশোদ্ভূত। অবশ্য দেশদুটির এ কুর্দি সম্প্রদায়ের সঙ্গে পিকেকের যোগসাজশের কোনও প্রমাণ তুরস্ক সরকার এখনও দেখাতে পারেনি।

উল্লেখ্য, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের হুমকি থেকে নিজেদের রক্ষায় ১৯৪৯ সালে পশ্চিমা কিছু দেশ মিলে আন্তর্জাতিক সামরিক জোট হিসেবে ন্যাটো (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন) গঠন করে। শুরুতে এর সদস্য সংখ্যা ছিলো ১২। বর্তমানে মোট ৩০টি দেশ এর সদস্য। প্রতিটি স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থন ছাড়া নতুন কোনও দেশ ন্যাটোর সদস্য হতে পারবে না। ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর সম্মতি ও অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষ করে একটি দেশের ন্যাটোর সদস্য পদ লাভে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগে।