বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

নাসার চন্দ্রাভিযান

আজ ৪০ মিনিট পৃথিবীর সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকবে আর্টিমিসের

প্রকাশিত: ২৩:৫৫, ৬ এপ্রিল ২০২৬;  আপডেট: ২২:৪৭, ৭ এপ্রিল ২০২৬

আজ ৪০ মিনিট পৃথিবীর সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকবে আর্টিমিসের

গত শুক্রবার প্রকাশিত ছবিতে মহাকাশে চলমান ওরিয়ন মহাকাশ যান এবং দূরে দৃশ্যমান চাঁদ। ছবি : নাসা।

মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার আর্টিমিস টু অভিযান সফলভাবে এর যাত্রা অব্যাহত রেখেছে। গত বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটে ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপিত একটি রকেটের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ১০ দিনের ঐতিহাসিক এ যাত্রা। 

৩২২ ফুটের স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (এসএলএস) নামের রকেটটির মাধ্যমে ওরিয়ন ক্যাপসুলে করে চার নভোচারীকে মহাকাশে প্রেরণ করে নাসা। আজ সোমবার যাত্রার ষষ্ঠ দিন চাঁদের একদম কাছাকাছি অবস্থান করছে ওরিয়ন নামের এ মহাকাশযানটি। 

খুব দ্রুতই চাঁদের কক্ষপথে প্রবেশ করবেন নভোচারীরা। আর, এর মধ্য দিয়ে এবারই প্রথমবারের মতো চাঁদের অজানা পৃষ্ঠের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করবে পৃথিবীবাসী।   

এর আগে, রকেট উৎক্ষেপণের ৫ মিনিট পর এ অভিযানের দলনায়ক রেইড ওয়াইজম্যান তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা চাঁদের অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখতে পাচ্ছি। আমরা সরাসরি এটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।’ 

এদিকে, আর্টিমিস টুয়ের নভোচারীদের মতো পৃথিবী থেকে এতো দূরে আর কখনো কোনো মানুষ যায়নি। তবে, প্রতিনিয়তই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের হিউস্টনে অবস্থিত নাসা স্পেস সেন্টারের কন্ট্রোল রুমে থাকা অভিযান পরিচালনাকারী বিজ্ঞানীরা।

এর মধ্য দিয়ে পৃথিবী থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও নিজ গ্রহের সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংযুক্ত থাকছেন চার নভোচারী। 

তবে, আজ ব্রিটিশ স্থানীয় সময় আনুমানিক রাত পৌনে এগারোটার দিকে (বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত প্রায় পৌনে পাঁচটায়) পৃথিবীর সঙ্গে সব ধরনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে ওরিয়ন মহাকাশযানটির। আর, টানা ৪০ চল্লিশ মিনিট এ অবস্থা বিরাজ করবে।

কারণ, এ সময় চাঁদের অদেখা পেছন পাশটায় থাকবেন চার নভোচারী। মূলত, এ সময় চাঁদের কারণেই কোনো ধরনের সংকেত প্রেরণ বা গ্রহণ করতে পারবেন না তারা। এ সময় পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন চার নভোচারী মহাকাশের গভীরে অবস্থান করে চাঁদ পর্যবেক্ষণে মনোযোগ দিবেন। 

ওরিয়ন মহাকাশযানের জানালা দিয়ে চাঁদ দেখছেন অভিযানের দলনায়ক রেইড ওয়াইজম্যান। ছবি : নাসা।

এ সময় তারা চাঁদের অদেখা এ অংশের ছবি তোলা, এর ভৌগলিক অবস্থা বিশ্লেষণসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজ করবেন। তবে, কন্ট্রোল রুমে থাকা বিজ্ঞানীদের জন্য স্বাভাবিকভাবেই এ ৪০ মিনিট হবে খুবই উত্তেজনাপূর্ণ ও একইসঙ্গে উদ্বেগের।

এ বিষয়ে অভিযান সংশ্লিষ্ট এক বিজ্ঞানী ম্যাট কসবি বলেন, ‘এবারই প্রথম আমরা নভোচারীসহ একটি মহাকাশযান পাঠালাম। যানটি চাঁদের পেছনে চলে যাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই আমরা কিছুটা উদ্বিগ্ন থাকবো। ফলে, আবার যখন আমরা যানটির দেখা পাবো তখনকার সময়টি হবে খুবই উত্তেজনাপূর্ণ, কারণ আমরা তখন জানতে পারবো যে তারা নিরাপদ রয়েছেন।’

অভিযানের বিস্তারিত :

১৯৭২ সালের অ্যাপোলো অভিযানের সমাপ্তির পর গত ৫০ বছরের মধ্যে এই প্রথমবারের মতো চাঁদের কক্ষপথে নভোচারী প্রেরণ করলো নাসা। চারজন নভোচারী নিয়ে যাত্রা শুরু করে আর্টিমিস টু নামের এ অভিযান।

৩২ তলা এ রকেট দিয়ে যাত্রা শুরুর সময় কেনেডি স্পেস সেন্টারের কাছে উৎসুক জনতা ভীড় জমায়। নভোচারী নিয়ে রকেটটি উৎক্ষেপিত হওয়ার পর উল্লাসে ফেটে পড়েন তারা।

তবে, তাদের এ যাত্রা সহজ ছিলো না। বেশ কয়েকবার তারিখ পরিবর্তনের পরই এ অভিযান শুরু করা সম্ভব হয়েছে। কারণ, এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বরে অভিযান শুরুর দিন ধার্য থাকলেও সে সময় ওরিয়ন ক্যাপসুলের হিটিং শিল্ডে দেখা দেওয়া সমস্যার কারণে তখন এ উদ্যোগ স্থগিত করতে হয়। 

পরবর্তীতে, চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য হলেও সে সময় রকেট থেকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হাইড্রোজেন নিঃসৃত হওয়ার কারণে অভিযান স্থগিত করে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আবার গবেষণাগারে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয় নাসা।

ফলে, বর্তমান এ যাত্রার আগেও উদ্বেগজনক সময় কাটিয়েছেন নাসার প্রকৌশলীরা। এ সময় রকেটের জ্বালানিসহ অন্যান্য কোনো কারিগরি ক্রটি হয় কিনা, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি ছিলো তাদের। তবে, তারপরও শেষ মূহুর্তে তাদের ব্যাটারি সেন্সর ও রকেটের ফ্লাইট টার্মিনেশন ব্যবস্থা সংক্রান্ত কিছু সমস্যার সমাধান করতে হয়েছে।

মহাকাশযান থেকে তোলো ছবিতে আমাদের পৃথিবী। ছবি : নাসা।

কারণ, এটি এমন একটি নিরাপত্তাজনিত ইস্যু যেটির সমাধান না হলে রকেটটি উৎক্ষেপণের পর পরই তা ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই, রকেট উৎক্ষেপণের আগে এর সমাধান করা ছিলো প্রকৌশলীদের জন্য খুবই জরুরি একটি বিষয়।

আর্টিমিস টু অভিযানের নভোচারী কারা?

নাসার তিন নভোচারীর সবাই আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রের পৃথিবী-কক্ষপথ সংক্রান্ত বিজ্ঞানের দক্ষ বৈজ্ঞানিক। অপরজন কানাডার দক্ষ যুদ্ধবিমান চালক।

রেইড ওয়াইজম্যান (৫০), অধিনায়ক: নাসার এ বিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক প্রধান ওয়াইজম্যানই এ অভিযান পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন। সাবেক এ পাইলট একসময় মহাকাশ বিজ্ঞানী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং তার রয়েছে মহাকাশ ভ্রমণের পূর্ব অভিজ্ঞতা।

ভিক্টর গ্লোবার (৪৯), পাইলট: মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক এ চালক এবার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী হিসেবে চাঁদ অভিযানে গেলেন। এর আগে তিনি স্পেসএক্স ক্র-১ হিসেবে মহাকাশ অভিযানে যান।

ক্রিস্টিনা কচ (৪৭), অভিযান বিশেষজ্ঞ: নারী নভোচারী হিসেবে সর্বাধিক ৩২৮ দিন মহাকাশযানে ভ্রমণের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এ বিজ্ঞ মহাকাশ বিজ্ঞানীর বেশ কয়েকবার মহাকাশে হাঁটাসহ এর গভীরে অভিযানের অভিজ্ঞতা রয়েছে।

জেরেমি হ্যানসেন (৫০), অভিযান বিশেষজ্ঞ: প্রথম কানাডিয়ান হিসেবে চাঁদে অভিযানে যাওয়া জেরেমি যুদ্ধবিমানের সাবেক পাইলট। মহাকাশের গভীরে অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে তার উপস্থিতি এ উদ্যোগে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বই উপস্থাপন করে।

ওরিয়ন মহাকাশযানের জানালা দিয়ে নিজের ফোন থেকে পৃথিবীর ছবি তোলেন নভোচারী ক্রিস্টিনা কচ। ছবি : নাসা।

কবে ফিরে আসছেন নভোচারীরা?

সবকিছু পরিকল্পনামতো সম্পন্ন হলে আগামী ১০ এপ্রিল পৃথিবী ফিরে আসবেন চার নভোচারী। এর আগে গত ১ এপ্রিল যাত্রা শুরুর পরবর্তী দুই দিন পৃথিবীর কক্ষপথে থেকে নিজেদের মহাকাশযানটির প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা সারেন নভোচারীরা। 

পরবর্তীতে, মহাকাশযানটিকে চাঁদের দিকে ধাবিত হতে যাত্রা শুরু করেন তারা। এ সময় পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে বেরিয়ে মহাকাশের গভীরে চলতে শুরু করে ওরিয়ন।  

এর পর যাত্রার তৃতীয় দিন অর্থাৎ গত ৩ এপ্রিল থেকে যাত্রার পঞ্চম দিন অর্থাৎ গতকাল ৫ এপ্রিল পর্যন্ত মহাকাশে যাত্রা করে চাঁদের আরও কাছাকাছি চলে যান নভোচারীরা। 

যাত্রার এ পুরো সময়টাতে সঙ্গে থাকা ফোন ও ক্যামেরা দিয়ে পৃথিবীর কাছের এবং দূরের অভূতপূর্ব সব ছবি তোলেন নভোচারীরা। একইসঙ্গে, কাছ থেকে চাঁদের ছবি তোলাসহ মহাকাশযান ওরিয়নে বসে নিজেদের কার্যক্রমের ভিডিও ফুটেজও পাঠাতে থাকেন তারা। 

এছাড়া, বেশ কয়েকবার কয়েকটি গণমাধ্যমের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন নভোচারীরা। তাদের এ যাত্রায় কিছু সমস্যা দেখা দিলেও বর্তমানে সব সমস্যার সমাধান করা হয়েছে বলে নাসার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

এদিকে, গতকাল চাঁদের মধ্যাকর্ষণ বলয়ে প্রবেশ করেছে মহাকাশযান ওরিয়ন। চাঁদের মধ্যাকর্ষন বল পৃথিবীর তুলনায় অনেক বেশি। ফলে, এ সময় প্রথম কয়েক ঘণ্টা নভোচারীরা তাদের স্পেসস্যুট পরীক্ষা করাসহ কতো দ্রুত তারা তা পড়তে এবং নিজেদের নির্ধারিত আসনে বসতে পারবেন, এটি পরীক্ষা করেন। 

আজ অভিযানের ষষ্ঠ দিন আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মহাকাশযানটি চাঁদের চারপাশ ঘুরে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ সময় যানটি চাঁদের খুব কাছাকাছি পৌঁছাবে। তখন চাঁদের উপরিভাগ থেকে মহাকাশযানটির দূরত্ব থাকবে মাত্র ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার মাইল।

গত বৃহস্পতিবার ওরিয়ন থেকে এবিসি ও ফক্স নিউজ গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন নভোচারীরা। ছবি : নাসা।

তাদের এ যাত্রা সফলভাবে সম্পন্ন হলে পরবর্তী তিনদিন অর্থাৎ আগামীকাল ৭ থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত আবারও পৃথিবীর পথে ফিরতি যাত্রা করবে মহাকাশযান ওরিয়ন। এ সময় নভোচারীরা মহাকাশের গভীরের বিভিন্ন অবস্থা পর্যবেক্ষণ করাসহ আরও নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাবেন।

পরিকল্পনমতো সব কাজ সম্পন্ন হলে আগামী ১০ এপ্রিল পৃথিবীর কক্ষপথে প্রবেশ করবেন তারা। ঘণ্টায় ২৫ হাজার মাইল বেগে মহাকাশযানটি পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে প্রবেশের পর প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণের মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক এ অভিযানের সমাপ্তি টানবেন চার নভোচারী।

উল্লেখ্য, এবারের অভিযানে আর্টিমিস টু চাঁদের বুকে অবতরণ করবে না। বরং, এর কক্ষপথের চারপাশ ঘুরে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসবে।

মূলত, মহাকাশযানে করে নভোচারীদের পক্ষে চাঁদের কক্ষপথে ভ্রমণ করা সম্ভব, এটি প্রমাণ করাই এ অভিযানের উদ্দেশ্য। এটি সফল হলে ২০২৮ সালে আর্টিমিস ৪ নামের এ ধরনের আরেকটি অভিযানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সূত্র : বিবিসি, আল-জাজিরা।