রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী : আদি ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা
নুসরাত জাহান
প্রকাশিত: ২১:৩৪, ২৪ আগস্ট ২০২৫; আপডেট: ১৩:৫১, ২৭ আগস্ট ২০২৫

মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের সে দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ায় তারা ‘দেশহীন’এক জাতিতে পরিণত হয়েছে। ছবি : উইকিপিডিয়া।
বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতিতে দিনদিনই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে রোহিঙ্গা ইস্যু। এ রোহিঙ্গা কারা, কেন তারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে, কতোজন রোহিঙ্গা এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, শরণার্থী শিবিরের পরিস্থিতি, এ শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি এবং জাতিসংঘের প্রস্তাবিত 'মানবিক করিডোর' - এসব বিষয় নিয়েই বিস্তারিত এ আলোচনা। আজ প্রকাশিত হলো এর প্রথম কিস্তি।
ভূমিকা
রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের আদি সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠী। এ সম্প্রদায় সুন্নি মুসলিম হলেও মূলত সুফিবাদের চর্চা করে থাকে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য হচ্ছে রোহিঙ্গাদের আদি নিবাস। তবে, তারা বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে স্থানান্তরিত অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বলে দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধরা অভিযোগ করে। কিন্তু, রোহিঙ্গারা যুগ যুগ ধরে মিয়ানমারেরই স্থায়ী বাসিন্দা। ২০১৭ সালের এক হিসাব মতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গার সংখ্যা ১০ লাখ। তারা মিয়ানমারের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। তবে, দেশটির মূল বৌদ্ধ জাতির তুলনায় তাদের ভাষা, ধর্ম এবং জীবনাচার - সবই ভিন্ন।
রোহিঙ্গাদের ইতিহাস
রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের আদি ক্ষুদ্র নৃ-জাতিগোষ্ঠী। জাতিগতভাবে তারা মুসলিম এবং মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অধিবাসী। মিয়ানমারের সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর তুলনায় তারা জাতি ও ভাষাগত এবং ধর্মীয় দিক থেকে ভিন্ন। তৎকালীন আরাকান রাজ্য থেকে ১৫ শতকে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম এ অঞ্চলে প্রথম পা রাখে। পরে ১৯ ও ২০ শতকের প্রথম দিকে আরও রোহিঙ্গা এ অঞ্চলে প্রবেশ করে। এ সময় রাখাইন অঞ্চল ছিলো ব্রিটিশ উপনিবেশের অধীন। ১৯৪৮ সালে এ অঞ্চল ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয় এবং ১৯৮৯ সালে তৎকালীন বার্মার নাম বদলে মিয়ানমার রাখে সে সময়কার শাসকরা। কিন্তু, মিয়ানমারে সে সময় ১৩৫টি নৃগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও দেশটির সরকার ওই অঞ্চলে রোহিঙ্গাদের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ, মিয়ানমার সরকার বরাবরই রোহিঙ্গাদের ‘বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে আসা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে উল্লেখ করে। মিয়ানমার সরকার ছাড়াও রাখাইন অঞ্চলের আধিপত্যবাদী রাখাইন বৌদ্ধরাও রোহিঙ্গাদের ওই অঞ্চলের বাসিন্দা বলে স্বীকৃতি দেয় না। এমনকি ‘রোহিঙ্গা’ নামটি নিয়েও তাদের আপত্তি রয়েছে।
কিন্তু, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের আদি জাতিগোষ্ঠী বলে প্রমাণ রয়েছে। যদিও ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবে ‘রোহাঙ্গ’ শব্দটি ‘আরাকান’ শব্দ থেকে উৎসারিত বলেই বহুল প্রচলিত। এটি এ অঞ্চলের রোহিঙ্গাদের কথ্য ভাষা, যেখানে ‘গা’ বা ‘গায়া’ অর্থ হচ্ছে ‘হতে’। অর্থাৎ, আরাকান হতে আগতরাই হচ্ছে রোহিঙ্গা। কারণ, ওই সময় এ অঞ্চল আরাকান রাজ্যের অধীন ছিলো এবং রোহিঙ্গারা ওই রাজ্যের আদিবাসী বলে থাইল্যান্ডভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আরাকান প্রজেক্টের পরিচালক ক্রিস লিওয়া উল্লেখ করেন।
মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের অবস্থা
মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের সে দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। এর ফলে তাদের নাগরিকত্ব নেই। এ কারণে প্রকৃতপক্ষে তারা ‘দেশহীন’ এক জাতিতে পরিণত হয়েছে। ১৯৯০ - এর দশকে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী নাগরিকত্বের পরিচয়পত্র দেয়, যাকে ‘হোয়াইট কার্ড’ বলা হয়ে থাকে। এটি তাদের এ দেশটিতে কিছু সুযোগ-সুবিধা দিলেও পূর্ণ নাগরিকত্বের অধিকার দেয়নি।
এ অবস্থায় গত ৩০ বছরের মধ্যে ২০১৪ সালে জাতিসংঘের সহায়তায় মিয়ানমারে প্রথম আদশুমারি করা হয়। এ সময় মুসলিম জাতিগোষ্ঠীকে প্রাথমিকভাবে 'রোহিঙ্গা' হিসেবে স্বীকৃতির অনুমোদন দেওয়া হলেও বৌদ্ধ জাতিগোষ্ঠী থেকে এ আদশুমারি প্রত্যাহারের হুমকি দেওয়া হয়। ফলে, তখন আদমশুমারি থেকে রোহিঙ্গাদের বাদ দেওয়া হয়। এ সময়, তারা ‘বাঙ্গালি’, রোহিঙ্গাদের পক্ষ থেকে এটা মেনে নিলেই শুধু তাদের নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়া হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একইভাবে, বৌদ্ধদের চাপে ২০১৫ সালে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী পরিচয়পত্রও বাতিল করে, যার ফলে আর সে সময় কোনো রোহিঙ্গার পক্ষে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়া সম্ভব হয়নি। এর আগে সাদা কার্ডধারীরা নির্বাচনে অংশ নিতে পেরেছিলো।
বর্তমানে মিয়ানমার সরকার বাধ্যতামূলকভাবে রোহিঙ্গাদের একটি জাতীয় পরিচয়পত্র রাখার নিয়ম চালু করেছে, যার মধ্য দিয়ে তাদের এই দেশের নাগরিক নয় বরং ‘বিদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এ পরিচয়পত্র একসময় তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র হবে বলে মিয়ানমার সরকার থেকে বলা হলেও এ সংক্রান্ত কোনো উদ্যোগ এখনও নিতে দেখা যায়নি। বরং, এর মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের সহজে চিহ্নিত করে তাদের অধিকার খর্ব করা হবে বলেই বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা।
রোহিঙ্গারা কেন পালিয়ে বেড়াচ্ছে
মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা সব ধরনের নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সেখানে বিয়ে করা বা সন্তান নেওয়া থেকে শুরু করে চাকরি, পড়াশোনা, ধর্মীয় আচার পালন এবং চলাচলের স্বাধীনতা - প্রতিটি ক্ষেত্রে পদে পদে বৈষম্যের শিকার হতে হয় তাদের। বিয়ের ক্ষেত্রে তাদের যে শুধু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়, সেটিই নয়; বিয়ের অনুমতি পেতে ঘুষ দেওয়াসহ পাত্রীর মাথায় হিজাব ও পাত্রের দাড়ি ছাড়া ছবি দেখাতে হয়। রোহিঙ্গারা মুসলিম হওয়ায় ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী নারীদের হিজাব পরা ও পুরুষদের দাড়ি রাখা বাধ্যতামূলক। নিজ শহরের বাইরে কোথায় বেড়াতে যাওয়া, এমনকি নতুন জায়গায় বসতি স্থাপনের জন্য তাদের সরকারের অনুমতি লাগে। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, পুরো মিয়ানমারে রাখাইনই হচ্ছে সবচেয়ে অনুন্নত রাজ্য এবং এখানে দারিদ্র্যের হার ৭৮ শতাংশ। এর বিপরীতে দেশটির বাকি অংশে এ হার মাত্র ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ (ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী)। দারিদ্র্যের ব্যাপক হার, দুর্বল অবকাঠামো এবং কাজের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকার কারণে দেশটিতে মুসলিম রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মূলধারার বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর জীবনমানের পার্থক্য দিন দিন বেড়ে চলেছে। ধর্মীয় কারণে সৃষ্ট এ পার্থক্য একসময় এ দুই জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয় - শেষ পর্যন্ত যা সংঘাতে রূপ নেয়।
আসছে দ্বিতীয় কিস্তি...