স্বাস্থ্য ও জীবনধারা

যে দেশে যা ব্রেকফাস্ট

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশিত: ২১:৫৩, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২

যে দেশে যা ব্রেকফাস্ট

বাহারি পদের নাস্তা দিয়ে দিনের শুরু, সঙ্গে কফি বা চা।

সকালবেলায় দিনের প্রথম খাবার খেয়ে আগের রাতের উপোস ভাঙ্গে বলে এর নাম 'ব্রেকফাস্ট' - বাংলায় 'নাস্তা'। দিনের প্রথম খাবার হিসেবে এই নাস্তা অনেকের কাছেই খুব গুরুত্বপূর্ণ। নাস্তার এ চল বিশ্বজুড়ে থাকলেও দেশে দেশে এর মেন্যু ও তৈরির ধরন বেশ বিচিত্র। চেখে না হলেও একবার অন্তত দেখে নেওয়া যেতে পারে বিভিন্ন দেশের জনপ্রিয় নাস্তার মেন্যু :

সুইজারল্যান্ড : কাজের দিনগুলোতে তাদের পছন্দের নাস্তা 'বার্চারমুজেলি'। গ্র্যানোলাজাতীয় ওটস, ফল ও বাদামের সমাহারে ঘন দইয়ের সঙ্গে পরিবেশিত হয় এই নাস্তা। তৈরিতে সময় লাগে কম, কিন্তু মেলে সারাদিনের কাজের শক্তি। অবশ্য ছুটির দিনগুলোতে সবার প্রিয় 'সুইস ব্রাঞ্চ'। এটি এক ধরনের প্যান কেক যা ডিম, রুটি, আলু, মধু, মাখন ও জ্যাম দিয়ে তৈরি করা হয়।

ইথিওপিয়া : নাস্তা হিসেবে এ দেশের প্রথম পছন্দ পোরিজ। নানা উপাদানে তৈরি ও বাহারি নামে প্রচলিত হলেও 'গেনফো' হলো এসবের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। গরম পানিতে বার্লির গুঁড়ো মিশিয়ে প্রথমে মণ্ড তৈরি করা হয়। এরপর মণ্ডের মাঝখানে গর্ত করে মাখনের সঙ্গে বিশেষ মশলা মিশিয়ে সেটি ভরাট করা হয়। এরপর চারপাশে দইয়ের প্রলেপ দিয়ে তৈরি করা হয় গেনফো।

জাপান : জাপানে সকালের নাস্তার সঙ্গে দিনের অন্যান্য বেলার খাবারের মেন্যুর খুব বেশি পার্থক্য হয় না। সকালের নাস্তা মূলত অনেকগুলো ছোট প্লেটে দেশীয় নানা পদের উপকরণ দিয়ে পরিবেশন করা হয়। স্যামন বা ম্যাকারেল মাছ, মিজো স্যুপ, আচার দেওয়া সবজি থেকে শুরু করে ভাত - এ সবই থাকে নাস্তার টেবিলে। সঙ্গে থাকে ডিমের মিষ্টি স্বাদের অমলেট 'টামাগোয়াকি'।

আইসল্যান্ড : এ দেশে নাস্তা হিসেবে জনপ্রিয় অত্যন্ত পুষ্টিকর 'লাইসি'। এটি তৈরিতে ব্যবহার করা হয় ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডে ভরপুর কড লিভার অয়েল। এ দেশের আরেকটি জনপ্রিয় নাস্তা হলো 'হাবরাগ্রেতুর'। ওটমিল ধরনের এ খাবারে থাকে বাদাম, কিশমিশ ও চিনি। অবশ্য চিনির বিকল্প হিসেবে অনেকের পছন্দ পনির।

সিঙ্গাপুর : দেশটিতে সকালের নাস্তা খেতে খোলা আকাশের নিচে ফুড কোর্টে লোকের ভিড় জমে। বাটি ভরে মশলাদার নুডুলস দিয়ে সকালের নাস্তা সেরে নেওয়া এ দেশের মানুষের বিশেষ পছন্দ। নাস্তায় তাদের আরেকটি পছন্দের আইটেম বিশেষ ধরনের স্যান্ডুইচ 'কায়া টোস্ট'। নারিকেলের দুধ দিয়ে তৈরি সুমিষ্ট জ্যাম ও ডিম দিয়ে তৈরি হয় এ স্যান্ডুইচ। অনেক সময় উজ্জ্বল সবুজ রং ও স্বাদে ভিন্নতা আনতে এতে ব্যবহার করা হয় একধরনের পাতা। কফি বা চায়ের সঙ্গে চমৎকার মানিয়ে যায় এ স্যান্ডুইচ। আর প্রতিটি দোকানে কায়া টোস্ট তৈরি হয় নিজস্ব ঢঙে।

মরক্কো : সেমোলিনা ব্রেড আর পুদিনার চা এ দেশে নাস্তার টেবিলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সঙ্গে থাকে বিশেষ ধরনের প্যানকেক। ম্যাপল সিরাপের বদলে মাখন আর মধু দিয়েই পাতলা সেমোলিনা ব্রেড সাজাতে পছন্দ করে এ দেশের মানুষ। পুরু ও মচমচে আরেক ধরনের সেমোলিনা ব্রেডের সঙ্গে তাদের পছন্দ পনির বা মাখন, জ্যাম ও মধু।

অস্ট্রেলিয়া : এ দেশের পছন্দের নাস্তায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রাধান্য পায় শস্যদানা, অ্যাভোকাডো ও নানা স্বাদের টোস্ট। ডিম পোচ, আচার দেওয়া সবজি বা চালের পুডিং, দই, বিভিন্ন জাতের বীজ ও রসালো ফল দিয়ে তারা তৈরি করতে পছন্দ করে নানা পদের নাস্তা। সঙ্গে থাকে বেশি করে দুধ দিয়ে তৈরি করা কফি।

আর্জেন্টিনা : এ দেশে নাস্তা মানেই প্যাস্ট্রি। স্থানীয়ভাবে 'ফ্যাকচুরা' হিসেবে পরিচিত এ প্যাস্ট্রি স্বাদে ও আকারে নানা রকমের হয়ে থাকে। স্বাদ-গন্ধ-আকৃতির ওপর ভিত্তি করে নানা পদের প্যাস্ট্রির নামগুলোও বেশ রাশভারি : মেডিয়ালুনস, বোম্বাস দে ফ্রেইল, বোলাস দে ফ্রেইল, চুরোস ইত্যাদি। এসবের কোনোটি ফ্রাইড ডোনাট ধরনের, আবার কোনোটি চকলেট, পাস্তেলেরা, ভ্যানিলা কাস্টার্ড বা ক্রিম দিয়ে মাখানো। গলা ভেজাতে ও শরীর-মন চাঙ্গা করতে সঙ্গে থাকে কড়া একমগ কফি।

জার্মানি : এ দেশে ফ্রুইস্টক (ব্রেকফাস্ট) মানেই সসেজ আর মাংসের নানা পদের প্রাধান্য। সসেজ, নানা ধরনের মাংসের টুকরো, পনির, রুটি, ফল, অল্প সেদ্ধ ডিম আর ঘরে তৈরি করা জ্যাম - এমন বাহারি উপকরণ দিয়ে সবাই নিজেদের পছন্দের নাস্তার প্লেট সাজিয়ে নেয়।

ব্রাজিল : সকালের নাস্তা হোক বা দিনের অন্য কোনও বেলার খাবার, এ দেশের সব মেন্যুতে চমৎকার মানিয়ে যায় জনপ্রিয় 'পন দেহ্ কেইঝো'। তুলতুলে এ চিজ রোল এখানকার মানুষদের সবচেয়ে প্রিয় খাবারের একটি। এ দেশের জনপ্রিয় আরেকটি খাবার বোলো দে ফুবা। পনির ও নারিকেলসহ নানা উপাদানে তৈরি এ খাবারও আসলে নরম ও ক্রিমে ভরা আরেক ধরনের কেক। এ দেশে বিকেলের নাস্তায় বোলো দে ফুবার কোনও জুড়ি নেই।

তিউনিসিয়া : ভোজনরসিকদের কাছে এ দেশের 'লাবলাবি' বিশেষ পছন্দের। এটি এক ধরনের স্যুপ। ছোলা ও হারিসা (ঝাল সস) এ স্যুপের অবিচ্ছেদ্য উপাদান, তবে সবাই নিজেদের পছন্দমতো বাড়তি উপকরণ মিশিয়ে তৈরি করে নেয় মশলাদার এ খাবার। নিজের মতো করে বৈচিত্র্য আনতে স্যুপে রুটির টুকরো, লেবুর রস, দই, জলপাই বা এমন আরও অনেক উপাদান থেকে বেছে নিয়ে যোগ করা হয় যার যা পছন্দ। স্যুপ তৈরির শেষে পরিবেশন করার সময় এর ওপরে পোচ ডিম যোগ করা কমবেশি সবারই পছন্দ। এতে একবাটি স্যুপের চেহারা দেখতে যেমন লোভনীয় হয়, তেমনি মেলে সারাদিনের পুষ্টি।

বুলগেরিয়া : এ দেশে নাস্তা হিসেবে বেশি প্রিয় 'পোপারা'। সারাদিনের খাবার থেকে বেঁচে যাওয়া রুটি দিয়ে পরদিন সকালের নাস্তা হিসেবে এটি তৈরি করা হয়। পোপারা তৈরির জন্য টুকরো করে কেটে নেওয়া রুটির ওপর গরম দুধ বা চা ঢেলে দেওয়া হয়। সঙ্গে যোগ করা হয় বিশেষভাবে প্রস্তুত অত্যন্ত নরম পনির, মাখন ও চিনি। এরপর এটিকে রেখে দেওয়া হয় যতক্ষণ পর্যন্ত না তা ভিজে একেবারে নরম হয়ে যায়। পোপারা দেখতে ও খেতে অনেকটাই পোরিজ বা রুটির পুডিংয়ের মতো, যদিও আদতে এটি এ দুটির কোনোটিই নয়। বুলগেরিয়ানদের বেশিরভাগেরই শৈশবের সবচেয়ে প্রিয় খাবার এটি।

তুরস্ক : এ দেশে সকালের নাস্তায় মোটামুটি সব ধরনের খাবারের সমারোহ দেখা যায়। ফেটা ও কাশকাভাল পনির, কালো ও সবুজ জলপাই, নানা ধরনের রুটি, ফলের প্রিজার্ভ, মধু, সুমিষ্ট মাখন ইত্যাদি পদের সমাহারে সাজানো হয় সকালের নাস্তা, যার স্থানীয় নাম 'কাহভালতে'। অনেকে আবার এসবের সঙ্গে যোগ করতে পছন্দ করেন ডিম, যা রান্না করা হয় মশলাদার সসেজের সঙ্গে বিফ ভেজে।

গুয়াম : প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট্ট এই দ্বীপটিতে রন্ধনশিল্প আলাদা একটি মাত্রা পেয়েছে। বিগত কয়েক শতক বিভিন্ন দেশের উপনিবেশ থাকার কারণে দ্বীপটির সংস্কৃতিতে বৈচিত্র্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাসের সংমিশ্রণ দেখা যায়। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের সবচেয়ে প্রিয় খাবারের তালিকায় প্রথমেই আসে নানা পদের সসেজ ও ফ্রাইড রাইসের নাম।

পর্তুগাল : অনেক বেশি দুধ দিয়ে তৈরি করা এক মগ কফি ছাড়া এ দেশের মানুষ সকালের নাস্তা শুরু করে না। অন্যান্য দেশে যেমন মূল খাবারকে পরিপূর্ণতা দিতে এর সঙ্গে কফি বা চায়ের মতো পানীয় পান করা হয়, এ দেশে সকালের নাস্তায় রীতিমতো কফিই 'প্রধান খাবার' আর এর সঙ্গে থাকে হালকা খাবার। কফির সঙ্গে তাদের বেশি পছন্দ টার্ট জাতীয় খাবার।

ইউক্রেন : 'সিরনিকি' এ দেশের নাস্তায় খুবই জনপ্রিয়। এটি পনির সমৃদ্ধ এক ধরনের প্যানকেক যার ভেতরটা তুলতুলে নরম কিন্তু বাইরের দিক মচমচে। আমেরিকান প্যানকেক বা ফ্রেঞ্চ টোস্টের মতো সিরনিকিকেও আরও উপাদেয় করে তোলা হয় এর সঙ্গে ফল, জ্যাম বা চিনি, টক স্বাদের ক্রিম ইত্যাদি যোগ করে।

জ্যামাইকা : 'আকি' ফল ও 'সল্টফিশ' (লবণ দিয়ে সংরক্ষিত কড মাছ) হলো এ দেশের জাতীয় খাবার। টমেটো, রসুন, মরিচ আর পেঁয়াজ দিয়ে রান্না করা মাছের সঙ্গে ভেজে নেওয়া হয় হালকা মিষ্টি ফল আকি। এতে নাস্তার প্লেটে নিশ্চিত হয় মিষ্টি, লবণাক্ত ও ঝালের বৈচিত্র্য।

তাইওয়ান : সয়া দুধ এ দেশের নাস্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। শীতকালে গরম আর গরমকালে ঠাণ্ডা অবস্থায় পরিবেশন করা হয় এই দুধ। সঙ্গে থাকে প্যানকেক, ডাম্পলিং, টুকরো সবজি ও মাংস ইত্যাদি।

ইতালি : এ দেশের মানুষের দিন শুরু হয় খুব ব্যস্তভাবে। তবে ব্যস্ততা যতোই থাকুক, সকালবেলা আয়েস করে এসপ্রেসো বা ক্যাপুচিনোর মগে চুমুক আর সঙ্গে প্যাস্ট্রি ছাড়া তাদের নাস্তা হয় না। রিকোটা পনির, চকলেট, কাস্টার্ড বা নাটেলার পাশাপাশি তুলতুলে নরম কিংবা কুড়মুড়ে - প্যাস্ট্রি বা কোয়াসনের ক্ষেত্রে যার যেমন পছন্দ, সে অনুযায়ী বেছে নেওয়ার সুযোগ তো থাকছেই।

আমেরিকা : মাখন-তোলা দুধ দিয়ে তৈরি করা প্যানকেক এ দেশে শিশু থেকে বৃদ্ধ সবারই সমান পছন্দের। বাহারি স্বাদের প্যানকেকের সঙ্গে পছন্দমতো যোগ করা হয় সিরাপ, চকলেট চিপস, মাখন, পনির বা ফল। এসবের মধ্যে অবশ্য মাখন আর ম্যাপল সিরাপই এ দেশের মানুষের সবচেয়ে বেশি পছন্দ।

রাশিয়া : ক্যাভিয়ার এ দেশের নাস্তার একটি বহুল জনপ্রিয় উপকরণ। প্রায় পুরো সপ্তাহ রুটি, মাখন আর ক্যাভিয়ার দিয়েই সেরে ফেলা হয় সকালের নাস্তা। আর ছুটির দিনগুলোতে প্যানকেকের ওপর ক্যাভিয়ার ছড়িয়ে দিয়ে নাস্তা করা তাদের একটি বড় আয়োজন। সকালের নাস্তাকে পরিপূর্ণ করতে সঙ্গে থাকে ব্ল্যাক টি।